৫৫৭ গ্রেফতার! অসমে কী চলছে?

একটা বিয়ে মানে দুটো পরিবারের মেলবন্ধন। আর সেই বিয়ের আড়ালেই যদি লুকিয়ে থাকে একটি নাবালিকার শৈশব কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ? অসমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ফের বড়সড় অভিযানে নেমেছে পুলিশ। আর সেই অভিযানে এখনও পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন ৫৫৭ জন। নথিভুক্ত হয়েছে ৪৭৬টি মামলা।

ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন নাবালিকাকে বিয়ে করার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তি, পরিবারের সদস্য এবং বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করানোর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ কেন এই ধরপাকড়? কবে থেকে শুরু হয়েছে পুলিশের এই অভিযান? শুধু বাল্যবিবাহে যুক্ত থাকার অভিযোগ, নাকি নাবালিকার উপর যৌন হেনস্থার অভিযোগেও মামলা হচ্ছে?

অসমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ফের সক্রিয় পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার দেওয়া তথ্য অনুসারে, ৫৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নথিভুক্ত হয়েছে ৪৭৬টি মামলা। এই অভিযানের সূত্রপাত গত মঙ্গলবার। একাধিক জেলায় একযোগে অভিযান চালায় পুলিশ। ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, দরং, শোণিতপুর, মরিগাঁও এবং কামরূপের মতো জেলায় ধরপাকড়ের খবর সামনে এসেছে। ধুবড়ি জেলাতেই ৬৬টি মামলায় ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৪ জন স্বামী, যাঁদের বিরুদ্ধে নাবালিকাকে বিয়ে করার অভিযোগ রয়েছে।

এবার প্রশ্ন, কেন বারবার বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে এমন বড় অভিযান চালাচ্ছে অসম সরকার? এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০২৩ সালে। সেই বছর থেকেই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে অসম সরকার। নাবালিকাদের সুরক্ষা, অল্প বয়সে গর্ভধারণের ঝুঁকি কমানো এবং মেয়েদের শিক্ষা অব্যাহত রাখার যুক্তি তুলে ধরে এই অভিযানের পক্ষে সওয়াল করেছে রাজ্য সরকার।

এরপর ২০২৩ সালের অক্টোবর এবং ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও বড়সড় অভিযান চালানো হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অভিযানে ৩৬৩টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল এবং গ্রেফতার হয়েছিলেন ৪৩২ জন। এবার সেই সংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়েছে গ্রেফতারের হিসেব। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা জানিয়েছেন, বাল্যবিবাহ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চলবে। অর্থাৎ, এটি এক দিনের পুলিশি অভিযান নয়। বরং গত কয়েক বছর ধরে চলা রাজ্য সরকারের ধারাবাহিক আইন প্রয়োগের অংশ।

ভারতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের জন্য রয়েছে Prohibition of Child Marriage Act, 2006। এই আইন অনুযায়ী, ২১ বছরের কম বয়সি পুরুষ এবং ১৮ বছরের কম বয়সি নারীকে বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে নাবালক-নাবালিকা হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আইনের আওতায় নাবালিকাকে বিয়ে করা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করানো ব্যক্তি এবং বিয়ে আয়োজন বা অনুমোদনে যুক্ত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ, শুধু বিয়ে করা ব্যক্তিই নয়, অভিযোগের ধরন অনুযায়ী বিয়ের আয়োজনকারী, পুরোহিত বা ধর্মীয় নেতা এবং বিয়ে হতে দেওয়া অভিভাবকরাও আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়তে পারেন।

কোনও বাল্যবিবাহের ঘটনায় নাবালিকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ থাকলে, পরিস্থিতি অনুযায়ী Protection of Children from Sexual Offences Act, অর্থাৎ POCSO আইনেও মামলা হতে পারে। এই আইনে ১৮ বছরের কম বয়সি প্রত্যেক ব্যক্তিকে নাবালক-নাবালিকা হিসেবে গণ্য করা হয়। নাবালিকার সঙ্গে যৌন অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।উদাহরণস্বরূপ, POCSO আইনের ৪ নম্বর ধারায় ধর্ষণের আওতাভুক্ত পেনিট্রেটিভ সেক্সুয়াল অ্যাসল্টের জন্য সাধারণভাবে ন্যূনতম ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। ১৬ বছরের কম বয়সি নাবালিকার ক্ষেত্রে শাস্তি আরও কঠোর।

অসম সরকারের দাবি, ধারাবাহিক পুলিশি অভিযানের ফলে রাজ্যে বাল্যবিবাহের ঘটনা কমেছে। ২০২৫ সালের একটি রিপোর্টে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ২০২৩ সাল থেকে পুলিশের পদক্ষেপের পর রাজ্যে বাল্যবিবাহ ৫৪ শতাংশ এবং কিশোরী গর্ভধারণ ৬৩ শতাংশ কমেছে বলে সরকারের মূল্যায়ন। তবে বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যার মোকাবিলায় শুধু গ্রেফতারই যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, সামাজিক রীতিনীতি এবং মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার চাপ এই বিষয়গুলিও সমস্যার সঙ্গে যুক্ত।

তাই একদিকে যেমন নাবালিকাদের সুরক্ষায় আইন প্রয়োগ জরুরি, তেমনই প্রয়োজন সচেতনতা, মেয়েদের শিক্ষা, পরিবারকে সহায়তা এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসনের ধারাবাহিক ভূমিকা। সব মিলিয়ে, অসমে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হয়েছে। প্রশ্ন একটাই পুলিশি অভিযান কি অসমকে বাল্যবিবাহমুক্ত করতে পারবে? নাকি এই সামাজিক ব্যাধির শিকড় উপড়ে ফেলতে আইনের পাশাপাশি আরও বড় সামাজিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে?সেই উত্তর দেবে আগামী দিনের পরিস্থিতি।