পুরুলিয়ায় কঠিন অস্ত্রোপচার করে প্রাণ বাঁচল রোগীর

পুরুলিয়ার দেবেন মাহাতো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে কঠিন অস্ত্রোপচার। চিকিৎসার পরিভাষায় এই অস্ত্রোপচার – রেডিক্যাল কোলেসিস্টেকটমি।

গৌতম প্রামাণিক, নিজস্ব সংবাদদাতা: সারা বাংলা যখন পুজোয় আনন্দ উৎসবে মেতেছিল তখন একজন দায়িত্ববান চিকিৎসক হিসেবে নিজের কাজে অবিচল থেকেছেন পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজের শল্য চিকিৎসক ডাঃ পবণ মণ্ডল। অষ্টমীর দিন জরুরী ভিত্তিতে এক প্রৌঢ়ার পিত্তথলিতে ক্যান্সারের জটিল অস্ত্রোপচার করলেন পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে। সরকারি এই হাসপাতালের সার্জারি (ইউনিট-টু) বিভাগে মহাষ্টমীর সন্ধ্যায় এই অস্ত্রোপচার করা হয়েছে হুড়া ব্লকের বাসিন্দা ষাট ছুঁইছুঁই ওই মহিলার।

ওই মহিলার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই প্রৌঢ়ার বেশ কিছুদিন ধরে হজমের সমস্যা চলছিল। তারপরে একটা সময়ে খেলেই বমি হতে থাকে। তখন বাঁকুড়ায় দেখানো হয় তাকে। সেখানে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, ওই মহিলার পিত্তথলিতে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে। বাঁকুড়ার চিকিৎসকরা তাঁকে কলকাতার এসএসকেএমে রেফার করেছিলেন। এ কথা শোনার পরই অথৈ জলে পড়েন ওই গরিব পরিবার। ওই মহিলার স্বামী  অনেক দিন আগে মারা গিয়েছেন। ছেলে পুরুলিয়াতে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। চিকিৎসার জন্য মাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না ছেলের। পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলে পুরুলিয়া মেডিক্যালের ক্যান্সার বিভাগের এই চিকিৎসকের কথা জেনে সেই হাসপাতালে পৌঁছয় সেই পরিবার। পুরুলিয়া মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত নোডাল অফিসার পবণ মণ্ডল জানিয়েছেন, ওই মহিলাকে মহালয়ার সময়ে বহির্বিভাগে আনা হয়েছিল। বাঁকুড়ায় দেখানোর পরীক্ষার রিপোর্ট রোগিণীর কাছে ছিল। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, পিত্তথলিতে ক্যান্সার হয়েছে। অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। কিন্তু আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার ছিল, পাশাপাশি অ্যানাস্থেসিয়ার পরীক্ষাও জরুরি ছিল। এই পরীক্ষাগুলি হতে হতে পুজো এসে পড়ে। পুজোর সময়ে জরুরি বিভাগের রোগীদের ছাড়া অন্য অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকে।

কিন্তু এই রোগিণীর ক্ষেত্রে আশঙ্কা ছিল যে, অপারেশনে দেরি হলে ক্যানসার আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, ডাঃ  পবণ মণ্ডল ছাড়াও চিকিৎসক মনিরুল ইসলাম ও কাথিক এস, অ্যানাস্থেটিস্ট সন্দেশ রাঠোর এবং তিন নার্স সোমানি দত্ত, রেশমি মণ্ডল ও শাবেনা খাতুনকে নিয়ে বিশেষ দল গড়ে মহাষ্টমীর সন্ধ্যাতেই ওই মহিলার অস্ত্রোপচার করা হয়। ওই সিনিয়র শল্য চিকিৎসক পবণ জানান, ‘পিত্তথলির মধ্যে একাধিক স্টোন দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকলে তা থেকে ক্যান্সার হতে পারে। এ ক্ষেত্রেও তা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। পিত্তথলির যে অংশ লিভারের সঙ্গে লেগে থাকে, মহিলার শরীরে সেই অংশেও ক্যানসার ছড়িয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে লিভারেরও কিছুটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। শরীরের এই অংশে কিছু লসিকাগ্রন্থি থাকে। তাও বাদ দিতে হয়েছে।

চিকিৎসার পরিভাষায় এই অস্ত্রোপচারের নাম রেডিক্যাল কোলেসিস্টেকটমি। জটিল অস্ত্রোপচার বলে পেট কেটে করতে হয়েছে। মহিলার পিত্তথলি থেকে কমবেশি চার সেন্টিমিটার মাপের তিনটি স্টোন বের হয়েছে। বর্তমানে রোগিণী স্থিতিশীল রয়েছেন। সফল এই অস্ত্রোপচার করতে সময় লেগেছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা। পুজোর সময় অসহায় রোগী ও তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ওই  চিকিৎসক ও তার সতীর্থদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রোগীর পরিবার।