আমেরিকার উদ্যোগে ‘প্যাক্স সিলিকা’

Pax Silica: চিনের উপর নির্ভরতা কমাতে এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দেশগুলিকে নিয়ে একটি শক্ত জোট গড়ে তুলছে এই প্যাক্স সিলিকা।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে প্রযুক্তি এখন আর শুধু উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। সেই প্রেক্ষিতেই সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রে উঠেছে একটি বিষয়। বিশ্বের ক্ষমতাশালী দেশগুলির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের তালিকা প্রকাশ হতেই নজর কাড়ে একটি বিষয়। সেখানে ভারতের নাম নেই। যে ভারত নিজের ভবিষ্যতের প্রযুক্তি শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে যে দেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বড় স্বপ্ন দেখছে। সেই ভারতই অনুপস্থিত আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত একটি নতুন কৌশলগত জোটের প্রথম বৈঠকে। এই অনুপস্থিতি শুধু একটি নাম বাদ পড়ার ঘটনা নয়, বরং তা নতুন করে প্রশ্ন তুলছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি রাজনীতির মঞ্চে ভারত ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে?

এই জোটের নাম প্যাক্স সিলিকা। সেমিকণ্ডাক্টর, উন্নত প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত করাই যার মূল লক্ষ্য। আধুনিক বিশ্বে চিপ উৎপাদন এখন আর শুধুই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়। বরং তা অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রতীক। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমেরিকা এই উদ্যোগ নিয়েছে। যাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দেশগুলিকে নিয়ে একটি শক্ত জোট গড়ে তোলা যায় ও চিনের উপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমানো যায়।

কী এই প্যাক্স সিলিকা ?

প্যাক্স সিলিকা আমেরিকার নেতৃত্বে গঠিত একটি কৌশলগত আন্তর্জাতিক উদ্যোগ
বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর, উন্নত প্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ ব্যবস্থা নিরাপদ করা
প্যাক্স শব্দের অর্থ স্থিতিশীলতা, সিলিকা এসেছে সিলিকন থেকে যা চিপ তৈরির মূল উপাদান
যাতে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য দেশগুলিকে নিয়ে একটি শক্ত জোট গড়ে তোলা
চিনের উপর নির্ভরতা কমাতেই এই উদ্যোগ আমেরিকার

আগামী দিনে প্যাক্স সিলিকার মূল লক্ষ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে আমেরিকা। প্যাক্স সিলিকার প্রথম পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেয় মোট ৯টি দেশ। কোন ৯টি দেশ এই বৈঠেকে ছিল?

১. আমেরিকা
২. জাপান
৩. দক্ষিণ কোরিয়া
৪. সিঙ্গাপুর
৫. নেদারল্যান্ডস
৬. যুক্তরাজ্য
৭. ইজরায়েল
৮. সংযুক্ত আরব আমিরশাহি
৯. অস্ট্রেলিয়া
এই দেশগুলির প্রত্যেকেই সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন, প্রযুক্তি গবেষণা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সরবহারে ক্ষেত্রে বিশ্ব মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অথচ দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতি হওয়া সত্ত্বেও ভারত এই তালিকায় জায়গা পায়নি, যা স্বাভাবিকভাবেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, ভারতের বাদ পড়া কোনো রাজনৈতিক বার্তা নয়। তাঁদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই জোটের প্রথম ধাপে শুধুমাত্র সেই দেশগুলিকেই নেওয়া হয়েছে, যারা বর্তমানে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি ও কার্যকরভাবে যুক্ত। ভারতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখনো বিকাশের পর্যায়ে রয়েছে। বড় উৎপাদন কেন্দ্র ও পূর্ণাঙ্গ সরবরাহ চেইন গড়ে উঠতে সময় লাগবে। সেই বাস্তবতার কারণেই আপাতত ভারত এই জোটের বাইরে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যা সব মহলতে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। শুল্ক-সংঘাত তো রয়েছে আমেরিকার সঙ্গে। আমেরিকার সঙ্গে বন্ধু রাষ্ট্রগুলির তালিকা থেকে ভারতের বাদ পড়া নিয়ে নরেন্দ্র মোদীকে কূটনৈতিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে, সম্প্রতি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভারত সফর ও রাশিয়া-চিন ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি ওয়াশিংটনের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। ব্রিকস জোটে ভারতের সদস্যপদ ও সম্ভাব্য নতুন মুদ্রা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ পুরোপুরি কাটেনি।

সব মিলিয়ে প্যাক্স সিলিকা থেকে ভারতের অনু্পস্থিতি শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়। বরং তা ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও বহন করেছে। বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে সরে যাওয়ার এই সময়ে ভারত যে নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করতে চাইছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফলে আগামী দিনে নয়াদিল্লির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দ্রুত বাস্তব রূপ দেওয়া। উৎপাদন পরিকাঠামো শক্তিশালী করা ও বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলার সঙ্গে কার্যকর ভাবে য়ুক্ত হওয়া। আমেরিকা ও পশ্চিমি জেশগুলির সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত কুটনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার দিকেও নজর দিতে হবে ভারতকে। একইসঙ্গে রাশিয়া ও ব্রিকসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নয়াদিল্লির কূটনীতির বড় পরীক্ষা। ভবিষ্যতে প্যাক্স সিলিকার পরিসর বিস্তৃত হলে সেই মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়াই ভারতের কাছে সবচেয়ে জরুরি। কারণ আগামী দিনের বিশ্বে ক্ষমতার মানচিত্র নির্ধারিত হবে প্রযুক্তির শক্তিতে। আর সেই দৌড়ে পিছিয়ে থাকার সুযোগ ভারতের হাতে আর খুব বেশি নেই।