ভাষাগত কারণে বাংলাদেশি তকমা!

স্বাগতা চন্দ্র, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ শুধুমাত্র ভাষাগত কারণে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া। নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত। দিল্লি পুলিশ জঙ্গলে ছেড়ে দিয়েছিল। হাত পা ধরে কেঁদেও মেলেনি মু্ক্তি। বাংলাদেশে গিয়েও এক কষ্টের অধ্যায়। আর দেশে ফেরা হবে কিনা তা জানতো না সোনালী খাতুন। সাধারণ গৃহবধূ ১০১ দিন কাটিয়ে ফেললেন বাংলাদেশের কারাগারে। প্রতিনিয়ত কষ্টে কেটেছে। ৬ বছরের সন্তানকে অনিশ্চিয়তার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। এখন চোখ বুজলে ভেসে ওঠে কারাগারে বন্দি থাকার মুহূর্ত। ভারতে প্রবেশ করেও ভুলতে পারছেন না সেইসব দিন। এ কোন দুঃসময় কাটাতে হল তাঁকে। জীবনের উপর দিয়ে যেন ঝড় বয়ে গেল।

বীরভূমের পাইকর এলাকার বাসিন্দা সোনালি বিবি। তাঁর স্বামী দিল্লিতে শ্রমিকের কাজ করতেন। তাই স্বামীর সঙ্গেই দিল্লিতে থাকতেন সোনালী বিবি, সঙ্গে তাঁদের ৬ বছরের সন্তান। বাংলাদেশি সন্দেহে সোনালি খাতুন, সুইটি বিবি ও তাঁর ছয় বছরের সন্তান-সহ মোট ১৬ জনকে পাকড়াও করে দিল্লি পুলিশ। তারপর অগাস্ট মাসে বিএসএফ-এর মাধ্যমে পুশব্যাক। এরপর ২১ অগস্ট সোনালিদের গ্রেফতার করে বাংলাদেশি পুলিশ। অনুপ্রবেশের অভিযোগ তুলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংশোধনাগারে বন্দি করা হয় তাঁদের। সোনালীর এই বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাকে’র বিরুদ্ধেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তাঁর বাবা। অভিযোগ, কোনওরকম যাচাই না করেই ভারত থেকে বলপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে সোনালীদের। সোনালীর বাবার আবেদনে শুনানি চলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতেই। উভয় দেশের আদালতের এই মর্মে উঠেছিল মামলা। তাঁদের ফেরাতে একদিকে সুপ্রিম কোর্টে চলে মামলা। অবশেষে মুক্তি পেয়েছে সোনালি বিবি ও তাঁর সন্তান। কিন্তু এখনও বাংলাদেশেই রয়েছেন তাঁর স্বামী। শুক্রবার রাতে ইংলিশ বাজারের মহদীপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে ফেরে সোনালি খাতুন এবং তার আট বছরের সন্তান খেটে খাওয়া সাধারণ ঘরের মানুষ। কখনও ভাবেতে পারেননি শুধুমাত্র বাংলা বলার জন্য এত দুর্ভোগ পোয়াতে হবে। রীতিমতো হতবাক অন্তসত্তা সোলানী বিবি। ভিন দেশে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। মুক্তি মিললেও এখনও ঘোর কাটেনি সোনালি বিবির।

শনিবার হাসপাতালে বাবাকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন সোলানি বিবি। এই ঘটনার পর সোনালিদেবীর ধনুক ভাঙা পণ, প্রাণ থাকতে আর নিজের গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবেন না। মেয়েকে ৬ মাস পরে দেখছেন। এবার আর কোথাও নয় গ্রামের বা়ড়িতেই থাকবে ওরা। জানালেন সোনালী বিবি বাবা।শুক্রবারই সীমান্তে তাঁদের হস্তান্তরকরণের পর সোনালী বিবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মালদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তাঁর শারীরিক পরীক্ষা করে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।শনিবার বীরভূমে চলে যান সোনালী বিবি। কেমন ছিল বাবা-মেয়ের মিলনের সেই মুহূর্ত।সোনালীর এই বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাকে’র বিরুদ্ধে অনেককেই পাশে পেয়েছিল এই পরিবার। শুক্রবার মহদীপুর সীমান্তে সোনালীকে রিসিভ করতে গিয়েছিলেন মালদা জেলাপরিষদের সভাধিপতি ও সহ সভাধিপতি।

ভারতীয় বাঙালি আর বাংলাদেশি কী এক। ভাবুন একবার শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার জন্য এত দুর্ভোগ পোয়াতে হল সোনালী বিবিকে। এই হেনস্থার দায় কে নেবে। ওই বাচ্চাটা মায়ের হাত ধরে যে সীমান্ত পেরিয়ে আবার নিজের দেশে ফিরল। শিশুমনে কতটা প্রভাব পড়ল। সোনালি বিবি তে ফিরে এসেছেন। তাঁকে মানবিকতার খাতিয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখন তাঁকে প্রমাণ করতে হবে তিনি ভারতীয়। সোনালি বিবির মতো এখনো বাংলাদেশে আটকে রয়েছে ৮০০ জন। কেন হবে এমনটা। আমরা তো গর্ব করে বলি আমি বাংলায় গান গায় বাংলার গান গায় আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাংলায় খুঁজে পায়। তবে বাংলার মানুষ হয়ে বাংলায় কথার বলার খেসারত পুশব্যাক কেন হবে। সত্যি ভাবার সময় এসেছে।