বাংলার ভোট নিয়ে কী বললেন, ২০২১-এ তৃণমূলের ছায়াসঙ্গী প্রশান্ত কিশোর?

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : একসময় বাংলার রাজনৈতিক ময়দানে চাণক্যের মতো পাশে ছিলেন তিনি। ২০২১-এর লড়াইয়ে তাঁর রণকৌশলেই ঘুরেছিল খেলার মোড়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল পেয়েছিল ঐতিহাসিক সাফল্য। কিন্তু ২০২৬-এ ছবিটা পুরোপুরি আলাদা। সেই ছায়াসঙ্গী এবারে নেই। প্রশ্নটা তাই আরও তীক্ষ্ণ। নিজের অভিজ্ঞতা, সংগঠন আর রাজনৈতিক বুদ্ধি দিয়েই কি আবারও জয়ের গল্প লিখতে পারবেন মমতা? নাকি এই অনুপস্থিতিই বদলে দেবে বাংলার ভোটের সমীকরণ? বাংলায় দুদফায় ভোট পর্ব মিটেছে। এখনও ফল প্রকাশ বাকি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলার ভোট নিয়ে কী বললেন, ২০২১-এ তৃণমূলের ছায়াসঙ্গী প্রশান্ত কিশোর? যার এক একটা কথা ভবিষ্যৎবাণীর সমান। ফলাফলের আগে সেই পিকে এবার কী ভবিষ্যৎবাণী করলেন? বাংলার কুর্সিতে এবার কে বসতে চলেছেন?
তাঁর বুদ্ধিমত্তাকে কুর্নিশ করেন না, এমন মানুষ দেশে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাঁর দূরদর্শিতার সামনে পোড়খাওয়া রাজনীতিকরাও থ হয়ে যান। বিধানসভা ভোট হোক বা লোকসভা, যে কোনও ভোটের খেলা ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর। নেপথ্যে অবশ্যই সুকৌশল। রাজনীতির চাল তাঁর নখদর্পণে। তাঁর হাত ধরেই সাফল্যের মুখ দেখেছেন দুঁদে রাজনীতিকরা। জেতার চাবিকাঠির মন্ত্র যেন তাঁর ঠোটস্থ। তাই ভোটের আগে তাঁর পরামর্শ নিতে দৌড়ন তাবড় রাজনীতিক। তাঁর দূরদর্শিতার উপর অগাধ ভরসা। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচন থেকে বাংলায় বিজেপির উত্থান। ঠিক দুই বছর পর ২০২১ সালে খেলা ঘুরে গিয়েছিল। তাঁর সংস্থা আইপ্যাককে কাজে লাগিয়েই তৃণমূল ভোট অঙ্ক কষেছিল। প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে প্রচারে যাবতীয় খুঁটিনাটির মধ্যে ছিল প্রশান্ত কিশোরের ছাপ।
তৃণমূল কংগ্রেস ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোরের সরাসরি নেতৃত্ব ছাড়াই লড়াই করছে। যদিও তাঁর সংস্থা আইপ্যাক এর সঙ্গে তৃণমূলের চুক্তি ২০২৬ সাল পর্যন্ত। প্রশান্ত কিশোর বর্তমানে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দল জন সুরাজ নিয়ে বিহারের রাজনীতিতে ব্যস্ত। নির্বাচনী কৌশল তৈরির কাজ থেকে বিরতি নেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করেছিলেন। যদিও প্রশান্ত কিশোর সরাসরি মাঠে নেই, তাঁর তৈরি করা সংস্থা আইপ্যাক এখনও তৃণমূলের হয়ে কাজ করছে। ২০২১ সালে তৃণমূলের ব্যাপক জয়ের পিছনে এই সংস্থার বড় ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।
তাঁর ভূমিকা শুধুমাত্র তৃণমূলের জেতার পিছনেই নেই। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদীকে ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরতে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। সেই সময়েই চায়ে পে চর্চা এবং ৩ডি র্যালির মতো প্রচার কৌশলের সূচনা করেন। ২০১২ সালের গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনেও মোদীর হয়ে কাজ করেছিলেন তিনি। ২০২০ সালের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে আম আদমি পার্টির বিশাল জয়ের পেছনে আই-প্যাকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ২০১৯ সালের অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে জগন মোহন রেড্ডির নিরঙ্কুশ জয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন পিকে। ২০২১ -র তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকে প্রধান এম কে স্ট্যালিনকে জয়ী করতে তিনি কৌশল নির্ধারণ করেন। ২০১৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে নীতীশ কুমারের নেতৃত্বে মহাগঠবন্ধন-র সাফল্যের অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি।
২০২১ সালে বিজেপিকে নিয়ে যখন অনেক জল্পনা-কল্পনা, সেই সময় পিকে দাবি করেছিলেন, বিজেপি যদি বাংলায় ১০০ আসনের গণ্ডি ছুঁতে পারে তবে তিনি রাজনৈতিক পরামর্শদাতার কাজ ছেড়ে দেবেন। তাঁর কথা মিলে গিয়েছিল অক্ষরে অক্ষরে। বিজেপি মাত্র ৭৭ আসনেই আটকে যায়। ২১৩টি আসন পেয়ে বাংলার কুর্সি দখল করে তৃণমূল।
২০২৬-র ভোটে দুই দফার ভোট মিলিয়ে ভোটদানের হার ৯৩ শতাংশ। এতো মানুষ ভোট দিয়েছেন দেখে একদিকে যখন বিজেপি বলছে তারাই সরকার গড়বে, অন্যদিকে তখন তৃণমূলের দাবি সরকার গড়ছে তারাই। এই নিয়ে এখন তুঙ্গে তরজা। আর এর মাঝে ভোটের ফলাফল ঘোষণার আগে, সোশ্যাল মিডিয়াতে তৃণমূলের আসন সংখ্যা নিয়ে একটি ভিডিও বার্তা দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি আশাবাদী , সরকার গড়বে তৃণমূলই। দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার সরকার গড়বে তৃণমূল।
চুপ করে বসে নেই বাংলার প্রধান বিরোধী দল। তাঁরা বলছে, বাংলা এবার বিজেপিকেই চাইছে। বাঙালি, অবাঙালি, হিন্দি, বাংলা সব বাদ দিয়ে জয় শ্রীরামের ধ্বনিতে ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ২০ হাজার গুজরাতি, ১২ হাজার মারোয়ারি, ৪ হাজার শিখ সমাজ, ৫ হাজার উৎকল সমাজ, ৮ হাজার ক্ষত্রিয় সমাজ ও ১২ হাজার পূর্বাঞ্চলীদের ভোটের হার ৯৬-৯৭ শতাংশ। ৯৫ শতাংশই BJP-তে ভোট দিয়েছেন। কাউকে ভয় না করে প্রকাশ্যেই তাঁরা বলেছেন পদ্মফুলে ভোট দিয়েছেন। দাবি শুভেন্দুর।
ফল প্রকাশের আগে তাই রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ ক্রমেই চড়ছে। একদিকে আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছে শাসকদল। অন্যদিকে পাল্টা লড়াইয়ে সমান আক্রমণাত্মক বিরোধীরা। এই টানটান পরিস্থিতির মাঝেই সবচেয়ে বেশি নজর এখন এক ব্যক্তির কথায়। প্রশান্ত কিশোর। তাঁর বিশ্লেষণ, তাঁর ইঙ্গিত। সবকিছুই যেন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে এই মুহূর্তে। কারণ অতীতে বারবার তাঁর ভবিষ্যৎবাণী মিলে যাওয়ায়, এবারও অনেকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁর দিকেই। তিনি কী বলছেন, কোন দিকে ইঙ্গিত করছেন। তা নিয়েই জল্পনা তুঙ্গে। কিন্তু না …২০২৬-র ভোট নিয়ে কোনও শব্দ ব্যয় করেননি প্রশান্ত কিশোর। তাই তাঁর ভবিষ্যৎবাণী এবারে কিছু নেই। এখন দেখার, ভোটবাক্স খুললে কোন সমীকরণ সামনে আসে। অভিজ্ঞতা, সংগঠন আর কৌশলের জোরে কি আবারও বাজিমাত করবে তৃণমূল? নাকি বদলের হাওয়া বইয়ে চমক দেখাবে বিজেপি? সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে স্ট্রংরুমে বন্দি সেই ইভিএমে। আর কয়েক দিনের অপেক্ষা। তারপরই স্পষ্ট হবে বাংলার রায়, কার দখলে যাবে নবান্নের কুর্সি।