আলোচনার টেবিলে শান্তি ফিরবে ?

ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কোনও রকম চালাকি, প্রতারণা বা সামান্য ভুল পদক্ষেপও তারা বরদাস্ত করবে না।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার অস্থির রাজনৈতিক আবহে ফের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আমেরিকা ও ইরানের সম্পর্ক। পাকিস্তানের ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফার বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা ঘিরে যখন জল্পনা তুঙ্গে। ঠিক তার আগেই বার্তা দিল তেহরান। প্রথম দফার আলোচনার অভিজ্ঞতা স্মরণ করিয়ে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে কোনও রকম চালাকি, প্রতারণা বা সামান্য ভুল পদক্ষেপও তারা বরদাস্ত করবে না। প্রয়োজনে পূর্ণ শক্তি নিয়ে জবাব দিতে প্রস্তুত দেশটি। এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবাফ। যা আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে গালিবাফ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে উভয় পক্ষেরই আন্তরিক সহযোগিতা জরুরি। কূটনৈতিক আলোচনার জন্য তেহরানের দরজা খোলা রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগকে কেউ দুর্বলতা ভবে ভুল করলে তার ফল ভয়াবহ হতে পারে। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, আমেরিকা যদি সামান্য ভুলও করে তবে ইরান সর্বশক্তি দিয়ে তার মোকাবিলা করবে। বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় দফার বৈঠকেও আমেরিকার উদ্দেশ্য নিয়ে ইরানের মনে সংশয় রয়ে গেছে।

গালিবাফ আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ইরান এখন আর আগের অবস্থায় নেই। সামরিক শক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং কৌশলগত প্রস্তুতিতে দেশটি অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিরোধ গড়ে তোলার মতো ক্ষমতা এখন ইরানের রয়েছে। তবে একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির বিচারে আমেরিকা এখনও অনেক এগিয়ে। বিশ্বজুড়ে সামরিক অভিযানের অভিজ্ঞতা এবং বিপুল সম্পদ আমেরিকার বড় সুবিধা। তবুও সেই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও ইরান সফলভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বলেই দাবি করেন তিনি। এই সংঘাতকে তিনি অসম যুদ্ধ আখ্যা দিয়ে বলেন, নিজেদের অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা ও সামরিক দক্ষতা কাজে লাগিয়েই তারা শত্রুপক্ষকে বারবার চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে।

কটাক্ষের সুরে গালিবাফ আরও বলেন, আমেরিকা ও ইজরায়েল বারবার কৌশলগত ভুল করেছে। শুধু ইরানের জনগণকেই নয়, দেশের সামরিক শক্তিকেও তারা ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছে। তাঁর মতে, এই ভুল ধারণাই তাদের বারবার বিপাকে ফেলেছে। এদিকে দ্বিতীয় দফার বৈঠক পাকিস্তানেই হতে পারে বলে জোর জল্পনা চলছে। সূত্রের খবর, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান তথা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির সম্প্রতি তেহরানে গিয়ে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি-সহ শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি আমেরিকার পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি তুরস্ক ও কাতারও মধ্যস্থতার ভূমিকায় সক্রিয় রয়েছে। অন্যদিকে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা অনেকটাই এগিয়েছে এবং খুব শীঘ্রই আরও সরাসরি বৈঠক হতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোরও প্রয়োজন পড়বে না। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এতটা আশাবাদী সুর শোনা যায়নি। ইরানের উপবিদেশমন্ত্রী খাতিবজাদে জানিয়েছেন, দুই পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো তৈরি না হলে কোনও বৈঠকেই তারা যেতে চান না। কারণ ব্যর্থ আলোচনা নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, বোঝাপড়া অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার চরমপন্থী অবস্থান এবং ইরানকে আন্তর্জাতিক আইনের ব্যতিক্রম হিসেবে দেখানোর চেষ্টা সেই প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আমেরিকার চাপের প্রসঙ্গেই তিনি এই মন্তব্য করেছেন। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, আন্তর্জাতিক আইন মেনে যা সম্ভব, ইরান শুধু সেই সীমার মধ্যেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। কোনও দেশের জন্য আলাদা নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া তারা মেনে নেবে না। এদিকে ট্রাম্প ইজরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করার পর ইরান হরমুজ প্রণালী খুলে দিয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফের তা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। খাতিবজাদের দাবি, আমেরিকা কথা রাখেনি। ইরানের জাহাজ চলাচলের উপর অবরোধ বজায় রাখার অবস্থান নেওয়াতেই তেহরান ফের সেই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেয়। সব মিলিয়ে বলা যায় যে, ইসলামাবাদের সম্ভাব্য বৈঠক শুধু দুই দেশের আলোচনাই নয়। তা গোটা পশ্চিম এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ নির্ধারণ করতে পারে। আলোচনার টেবিলে শান্তির সম্ভাবনা থাকলেও, তার চারপাশে এখনও ঘনিয়ে রয়েছে সংঘাতের ছায়া। এখন দেখার কূটনীতি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ভাষাকে হার মানাতে পারে কি না।