যে জায়গা দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ,বিক্ষোভ আর গণদাবির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, এবার সেই যন্তর মন্তর থেকেই সরতে হবে আন্দোলনকারীদের। রাজধানী দিল্লির রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়সড় পরিবর্তন। যন্তর মন্তরকে আর প্রতিবাদস্থল হিসেবে রাখা হচ্ছে না। তার বদলে বিক্ষোভ ও ধর্না কর্মসূচির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে তিনটি বিকল্প জায়গা রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিল্লি পুলিশ। সোমবার ১২ অক্টোবর এই নির্দেশিকা প্রকাশ্যে আসতেই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, প্রতিবাদ কর্মসূচির স্থান পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত কি শুধুই প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নাকি এর ফলে রাজধানীতে আন্দোলন করার ধরনটাই বদলে যেতে চলেছে?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক
দিল্লি পুলিশের প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তৈরি করা একটি কমিটি বিকল্প প্রতিবাদস্থল নিয়ে সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা নির্দেশিকায় নতুন তিনটি জায়গার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলি হল পুরনো দিল্লির রামলীলা ময়দান, উত্তর দিল্লির বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি গ্রাউন্ড। এই তিনটি জায়গায় প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করা যাবে। তবে তার জন্য কীভাবে অনুমতি নিতে হবে, কী কী নিয়ম মানতে হবে এবং কোন পদ্ধতিতে কর্মসূচি পরিচালিত হবে, তা নিয়ে পৃথক নির্দেশিকা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর-এসওপি প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন প্রতিবাদস্থল নির্ধারিত হলেও সেখানে কর্মসূচি আয়োজনের বিস্তারিত নিয়ম এখনও সামনে আসার অপেক্ষায়।
এখানেই রয়েছে এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য। কারণ, যন্তর মন্তর শুধুমাত্র দিল্লির একটি রাস্তা বা নির্দিষ্ট জায়গার নাম নয়। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ নিজেদের দাবি, অভিযোগ ও ক্ষোভ তুলে ধরতে এই জায়গাকে বেছে নিয়েছেন। রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে ছাত্র সংগঠন, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন পেশার মানুষ বহু আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে যন্তর মন্তর। জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির সময়ে এই জায়গা বারবার সংবাদ শিরোনামে এসেছে। ফলে সেই পরিচিত প্রতিবাদস্থলকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। এখন থেকে রাজধানীতে বিক্ষোভ দেখাতে চাইলে আন্দোলনকারীদের নতুন করে জায়গা বেছে নিতে হবে ও সংশ্লিষ্ট নিয়ম মেনে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে।

দিল্লি পুলিশের এই সিদ্ধান্তের ঠিক আগেই রাজধানীতে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির প্রতিবাদ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল দলটি। ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই এই দাবি সামনে আসে। বিরোধী রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বহু মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের শাসক পক্ষের অবস্থান এই অভিযোগের সঙ্গে এক নয়। এই বিতর্কের মধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেই কর্মসূচিকে ঘিরে শুরু হয় ধরপাকড়। ১০ অক্টোবর, শনিবার যন্তর মন্তরে পৌঁছনোর আগেই সিজেপির নেতা-কর্মীদের আটক করার ঘটনা সামনে আসে। পুলিশের বক্তব্য ছিল, কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তাঁদের প্রতিবাদ কর্মসূচি আটকানোর জন্য ব্যাপক পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয় এবং অনেকেই নির্ধারিত স্থানে পৌঁছতে পারেননি। ফলে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ করার অধিকার, প্রশাসনের অনুমতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়। এই পরিস্থিতিতে সিজেপির তরফে ফের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সোমবার সকালে সিজেপির তিন শীর্ষ নেতা-নেত্রী দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যান। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের জন্য পুলিশের অনুমতি চাওয়া। দলের তরফে জানানো হয়েছিল, অনুমতি না দেওয়া হলে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করা হবে। আর ঠিক এই টানাপড়েনের মধ্যেই প্রকাশ্যে আসে দিল্লি পুলিশের নতুন নির্দেশিকা। সেই নির্দেশিকায় যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিকল্প তিনটি জায়গার নাম ঘোষণা করা হয়। ফলে সিজেপির কর্মসূচির অনুমতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক আরও বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের সঙ্গে জুড়ে যায়।দলের প্রধান অভিজীৎ দীপক এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন, কেন যন্তর মন্তরকে বাদ দিয়ে অন্য জায়গাগুলিকে বেছে নেওয়া হল? যন্তর মন্তরের আশপাশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দফতর রয়েছে। রাজধানীর কেন্দ্রীয় এলাকায় বড় জমায়েত হলে যান চলাচল, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাজকর্মে প্রভাব পড়তে পারে। এমন যুক্তি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন নির্দেশিকার ক্ষেত্রে দিল্লি পুলিশের প্রকাশিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মূল ভিত্তি হল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কমিটির সুপারিশ। সিদ্ধান্তের পিছনে নির্দিষ্ট কোন কোন কারণ কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা বুঝতে হলে বিস্তারিত সরকারি নির্দেশিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাই প্রশাসনিক যুক্তি নিয়ে আলোচনা করা গেলেও, এর পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বিকল্প জায়গা নির্ধারণের সঙ্গে আরও একটি বিষয় জড়িয়ে রয়েছে প্রতিবাদকারীদের বাস্তব অসুবিধা। রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও সিবিডি গ্রাউন্ড রাজধানীর বিভিন্ন অংশে অবস্থিত। যন্তর মন্তরের সঙ্গে এই জায়গাগুলির দূরত্ব, যাতায়াতের সুবিধা, কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ এক রকম নয়। ফলে নতুন নিয়ম কার্যকর হলে রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলিকে তাদের কর্মসূচি নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। বিশেষ করে দিল্লির বাইরে থেকে আসা ছাত্রছাত্রী, কর্মী ও সাধারণ মানুষের জন্য অনুমতি পাওয়ার পদ্ধতি কতটা সহজ হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। নতুন নির্দেশিকায় এই বিষয়গুলি কীভাবে বিবেচনা করা হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু দিল্লির একটি জায়গা পরিবর্তনের ঘটনা নয়, এটি রাজধানীতে আন্দোলন ও গণদাবি জানানোর ভবিষ্যৎ পদ্ধতি নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে প্রশাসনের নির্ধারিত নিয়ম ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। অন্যদিকে নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়। সিজেপি নেতৃত্বের পুরো দেশই যন্তর মন্তর হবে মন্তব্যও বুঝিয়ে দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক সহজে থামার নয়। তাহলে কি যন্তর মন্তর থেকে প্রতিবাদের ঠিকানা সরলেও মানুষের প্রতিবাদের আওয়াজ থামানো সম্ভব? নাকি নতুন জায়গা থেকেই আরও জোরালো হবে আন্দোলনের দাবি?