প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,পুরোনো মূর্তিগুলো থেকে ‘ব্রহ্ম’ বা আত্মা বা ঐশ্বরিক শক্তি অতি গোপনে নতুন মূর্তিগুলোতে স্থানান্তর করা হয়।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ওড়িশার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দির হিন্দুধর্মের অন্যতম প্রধান তীর্থক্ষেত্র এবং চারধামের একটি। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যিনি জগন্নাথ রূপে, তাঁর দাদা বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রা পূজিত হন।জগন্নাথ দেবের ইতিহাস পৌরাণিক বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তথ্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিষ্ণুর স্বপ্নাদেশ পেয়ে ‘নীলমাধব’ রূপে পূজিত এই দেবতাকে কাঠ ও দারু দিয়ে পুনরায় নির্মাণ করেন। ভাবছেন তো পুনরায় নির্মান মানে কি? এর উত্তর পেতে গেলে একটু ইতিহাস জানতে হবে।
ইতিহাস বলে, ভগবান জগন্নাথ মূলত আদিবাসী ভিল ও শবর সম্প্রদায়ের আরাধ্য দেবতা ছিলেন। তিনি নীলকান্ত মণি বা ‘নীলমাধব’ রূপে গভীর অরণ্যে পূজিত হতেন। স্কন্দপুরাণে উল্লেখ আছে, ভগবান জগন্নাথ পূর্বে ‘নীলামাধব’ নামে এক নীল রঙের প্রস্তরখণ্ড হিসেবে পূজিত হতেন। তিনি বিশ্ববসু নামক এক শবর রাজার আরাধ্য দেবতা ছিলেন।সাধারণত সনাতন ধর্মের দেব-বিগ্রহ পাথর বা ধাতুর তৈরি হয়। কিন্তু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি কাঠ দিয়ে তৈরি, যা অরণ্যবাসী আদিবাসীদের বৃক্ষ বা কাষ্ঠ পূজার প্রাচীন ঐতিহ্যের সরাসরি প্রতিফলন। তাইতো পুরীর মন্দিরে রথযাত্রার পূর্বে ‘অনবসর’ বা স্নানযাত্রার পরবর্তী সময়ে পূজার দায়িত্ব মূল পুরোহিতদের বদলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বংশধর ‘দৈতাপতি’ বা শবর সম্প্রদায়ের লোকেরাই পালন করেন।
জগন্নাথ মন্দিরের একটি অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য হলো ‘নবকলেবর’। ১২ বা ১৯ বছরের ব্যবধানে পুরোনো কাঠের বিগ্রহ পরিবর্তন করে নতুন দারু বিগ্রহ নির্মাণ করা হয়।নতুন বিগ্রহ তৈরির জন্য বিশেষ লক্ষণযুক্ত নিম গাছের সন্ধান থেকে শুরু করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও বৈদিক আচার পালিত হয়। এই অতি গোপনীয় আচারের মাধ্যমে আগের বিগ্রহের ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ যাকে জগৎন্নাথ দেবের হৃদয় হিসাবে মানা হয়, সেটি নতুন বিগ্রহে স্থানান্তরিত করা হয়। এই সময় পুরিতে নবকলেবর উৎসব পালিত হয়। আক্ষরিক অর্থে ‘নবকলেবর’ শব্দের অর্থ হলো ‘নতুন শরীর’।এই উৎসবে ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা এবং সুদর্শন চক্রের পুরোনো কাষ্ঠনির্মিত মূর্তিগুলো পরিবর্তন করে নতুন দারু বা নিম কাঠ দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর, যখন হিন্দু চন্দ্রমাসে একটি অতিরিক্ত আষাঢ় মাস বা ‘মলমাস’ আসে, ঠিক তখনই এই উৎসব উদযাপিত হয়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী,পুরোনো মূর্তিগুলো থেকে ‘ব্রহ্ম’ বা আত্মা বা ঐশ্বরিক শক্তি অতি গোপনে নতুন মূর্তিগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। পুরোনো মূর্তিগুলো মন্দিরের ভেতরেই ‘কৈলী বৈকুণ্ঠ’ নামক স্থানে সমাধিস্থ করা হয়।

সনাতন ধর্মে চার ধামে ভগবান জগন্নাথের চারটি ভিন্ন লীলা ও কাজ রয়েছে। পুরী ধামে তিনি অন্ন গ্রহণ বা ভোজন করেন। এই বিশ্বাস অনুযায়ী পুরীর মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য অপরিসীম।পুরী জগন্নাথ মন্দিরে ভগবান জগন্নাথকে প্রতিদিন ৫৬ রকমের ভোগ বা ‘ছাপ্পান ভোগ’ নিবেদন করা হয়।পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রন্ধনশালা বা ‘রোসাঘর’ বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত রান্নাঘর। প্রায় ৬০০ জন রাঁধুনি ও ১০০০ জন সহকারী নিষ্ঠার সাথে কাজ করেন। প্রতিদিন মাটির পাত্রে ৭৫২টি উনুনে ৫৬টি ভোগ রান্না হয়। কথিত আছে, এখানে প্রসাদ কখনও নষ্ট হয় না বা কম পড়ে না। রান্নার সময় মাটির হাঁড়িগুলো একে অপরের ওপর সাজিয়ে রাখা হলেও সবচেয়ে ওপরের হাঁড়ির রান্না আগে হয়। রান্নাঘরের গঙ্গা ও যমুনা নামক দুটি কূপের পবিত্র জল ব্যবহার করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, মা লক্ষ্মী নিজে তদারকি করেন বলেই মহাপ্রসাদ এত সুস্বাদু হয়। কোনো কারণে রান্নায় কোনো ত্রুটি হলে বা মা লক্ষ্মী অসন্তুষ্ট হলে মন্দিরের নিয়ম ভেঙে কুকুর প্রবেশ করে, তখন পুরো ভোগ ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে রান্না করতে হয়।রান্না শেষ হলে তা প্রথমে ভগবান জগন্নাথ এবং পরে দেবী বিমলাকে নিবেদন করা হয়। এরপরই এটি ‘মহাপ্রসাদে’ রূপান্তরিত হয় এবং আনন্দ বাজারে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
বর্তমানে পুরীর যে বিশাল জগন্নাথ মন্দিরটি দেখা যায়, তার মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন গঙ্গা রাজবংশের রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।রাজা অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গ দেব এর সূচনা করলেও, পরবর্তীতে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রাজা অনঙ্গভীম দেব এই মন্দিরটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন এবং বর্তমান রূপ দান করেন।ঐতিহাসিক ও মন্দির নথির বর্ণনা অনুযায়ী, এর আগেও এই স্থানে ছোট মন্দির বা উপাসনালয় ছিল। সম্পূর্ণ মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন।মন্দিরের মূল দেউল এবং সংলগ্ন মণ্ডপগুলো প্রাচীন ওড়িশান স্থাপত্যের চমৎকার নিদর্শন। মন্দিরের স্তম্ভ, দেওয়াল ও ছাদ প্রাচীন হিন্দু দেব-দেবী, পৌরাণিক গল্প ও প্রাকৃতিক মোটিফের খোদাই করা ভাস্কর্য এবং নকশা দিয়ে সাজানো থাকে। মন্দিরের চূড়ায় প্রতিদিন নতুন রঙের ‘পতিত পাবন’ বা ‘নীলচক্রের ধ্বজা’ বাঁধা হয়, পতাকার দিক সব সময় বাতাসের বিপরীত দিকে ওড়ে।। জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার কাঠের মূর্তিগুলোকে বিভিন্ন ঋতু এবং তিথি অনুযায়ী সুতির কাপড়, জরির কাজ করা বস্ত্র ও সোনা-রূপার গয়না পরিয়ে সাজানো হয়।মন্দিরের সিংহদ্বারে প্রবেশ করার সাথে সাথেই সমুদ্রের ঢেউয়ের আওয়াজ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যা একটি বড় রহস্য।এছাড়া দিনের যেকোনো সময় মূল মন্দিরের কোনো ছায়া মাটিতে পড়ে না। মন্দিরের চূড়ার ওপর দিয়ে সাধারণত কোনো পাখি বা বিমান উড়তে দেখা যায় না।
এককথায় পুরীতে জগন্নাথ মন্দির এবং ভগবান জগন্নাথের মাহাত্ম্য এক কথায় বিস্ময়কর। মন্দিরটির স্থাপত্য ও দৈনন্দিন আচার-অনুষ্ঠানকে ঘিরে এমন অনেক অলৌকিক ও বৈজ্ঞানিক রহস্য রয়েছে যা ভক্ত ও গবেষক উভয়কেই অবাক করে দেয়।