সমুদ্রের ঢেউ কাড়ল রাহুলের প্রাণ !

দুপুরের প্যাকআপের পরও কিছু দৃশ্য বাকি থাকায় থেকে গিয়েছিলেন রাহুল, নায়িকা শ্বেতা ও পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল। পরিকল্পনা ছিল..

রিয়া দাস, সাংবাদিক : একটা ঢেউ কখন যে গল্প হয়ে ওঠে আর একটা মুহূর্ত কখন ইতিহাস। তা কেউ আগে থেকে বুঝতে পারে না। একটা গল্প কখন শেষ হয়ে যায় তা আমরা বুঝতে পারি না। যতক্ষণ না হঠাৎ করে সব শব্দ থেমে যায়। ঢেউয়ের শব্দ থাকে, আকাশ একই রকম নীল থাকে কিন্তু যার জন্য গল্পটা এতদিন বয়ে চলছিল সে আর থাকে না। হয়তো ঠিক তেমনই এক বিকেলে অজান্তেই নিজের জীবনের শেষ দৃশ্যের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। যে মানুষটা একসময় ভালোবাসার গল্প শিখিয়েছিলেন বাংলার ছবির দর্শককে। তাঁর জীবনটাই যেন হঠাৎ করে থেমে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের মাঝে। গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর এক পার্টিতে সাঁতার কাটতে গিয়ে ডুবে যান পিয়া রে-র সেই মায়াবী কণ্ঠের শিল্পী জুবিন গর্গ। দুই মানুষ, দুই জায়গা। তবুও যেন এক অদ্ভূত মিল। নোনা জলের ঢেউই কেড়ে নিল এক কণ্ঠ আর এক মুখকে। কী আশ্চর্য এক সমাপতন। আজ তাই শুধু একটা অনুভূতি রয়ে যায় মানুষের মনে। আর সেই গান দিল ব্যাথা, আঁধারের নীবরতা.. মনে জাগে আকুলতা।

সবকিছুর শুরুটা ছিল এক নিঃশব্দ বিস্ময় দিয়ে। রাহুলের বাবা ছিলেন প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ও শিক্ষক বিশ্বনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রয়াত হন ২০২১ সালে। বাবার প্রয়াণে অবসাদেও ভুগছিলেন রাহুল। রাহুলের অভিনয় জীবনের হাতেঘড়ি হয়েছিল তাঁর বাবার থিয়েটার দলেই। ২০০৮ সালে পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর পরিচালনায় চিরদিনই তুমি যে আমার ছবিতে প্রথমবার বড় পর্দায় দেখা যায় রাহুলকে। সেই সময় জিত আর দেবের মধ্যেই মুগ্ধ ছিল বাংলার দর্শক। তবে কৃষ্ণ আর পল্লবীর সেই প্রেম কেবল একটি সিনেমার গল্প ছিল না সেটা হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের অনুভূতি। সহ-অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কার সরকারের সঙ্গে তাঁর পর্দায় রসায়ন এতটাই সত্যি ছিল যে বাস্তব জীবনেও সেই সম্পর্ক জায়গা করে নেয়। ভালোবাসা, দূরত্ব, ভাঙন আবার ফিরে আসা। সব মিলিয়ে তাঁদের গল্পটা যেন জীবনের মতোই অসম্পূর্ণ অথচ গভীর ছিল। ২৯ মার্চ রবিবার। তালসারি সৈকতে চলছিল ভোলে বাবা পার করেগা ধারাবাহিকের শুটিং। দিনের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে সমুদ্রের হাওয়া যেন ক্লান্ত শরীরকে একটু শান্তি দিচ্ছে। দুপুরের প্যাকআপের পরও কিছু দৃশ্য বাকি থাকায় থেকে গিয়েছিলেন রাহুল, নায়িকা শ্বেতা ও পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল। পরিকল্পনা ছিল খুব সাধারণ অল্প জলে দাঁড়িয়ে সংলাপ বলা। কিন্তু জীবন তো কখনও চিত্রনাট্যের নিয়ম মানে না।

ধীরে ধীরে প্রায় অজান্তেই রাহুল এগোতে শুরু করেন সমুদ্রের গভীর দিকে। প্রথমে হাঁটু, তারপর কোমর জল বাড়তে থাকে। আরক সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে উদ্বেগ। ইউনিটের সদস্যরা বারবার তাঁকে থামতে বলেন কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন সব শব্দ হারিয়ে যাচ্ছিল ঢেউয়ের গর্জনে। সহ অভিনেত্রীর হাত ধরা অবস্থাতেই তিনি এগিয়ে চলছিলেন। হঠাৎ করেই এক মুহূর্ত, ভারসাম্য হারানো, জলে ডুবে যাওয়া আবার উঠতে চেষ্টা। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে তীরে তোলা হয়। তাঁর সহ-অভিনেত্রীকে আগে তোলা হয় পরে রাহুলকে তোলা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায় তখনও তাঁর চোখে ছিল সচেতনতার আভাস। সময় নষ্ট না করে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় দিঘা সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু জীবনের সঙ্গে সেই লড়াইটা শেষ পর্যন্ত জেতা হয়নি। হাসপাতালে নির্জন এক কক্ষে সমস্ত শব্দ থেমে যায়। একটি প্রাণ, একটি সম্ভাবনা, একটি গল্প সেখানেই থেমে থাকে। এই ঘটনার পর থেকে একের পর এক প্রশ্ন উঠে আসছে। শুটিং চলাকালীন না কি শুটিংয়ের পরে ঠিক কখন এবং কীভাবে তিনি জলে নামলেন তা নিয়ে নিয়ে ইউনিটের সদস্যদের বয়ানে মিল নেই। প্রযোজক লীনা গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, স্ক্রিপ্টে গভীর জলের কোনও দৃশ্যই ছিল না। কেউ বলছেন তিনি একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন আবার কেউ বলছেন দৃশ্যের প্রয়োজনে জলে নামা। সত্যিটা এখনও পরিষ্কার নয়, তদন্ত চলছে। কিন্তু এই সমস্ত প্রশ্নের মধ্যেও একটা সত্য সবচেয়ে ভারী হয়ে আছে তিনি আর নেই।

রাহুলের অকাল মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ টলিপাড়া। কেউই বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না যে রাহুল আর নেই। সবাই তাঁর মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি করছেন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স হ্যান্ডলে রাহুলের বন্ধু থেকে সহকর্মী সবাই শোকপ্রকাশ করেছে। রাহুলের সহ-অভিনেত্রী শ্বেতারও একটা ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে শোকে বিহ্বল নায়িকা। শুটিং করার সময় নিরাপত্তা কোথায় ছিল সেই প্রশ্নও উঠছে। দিঘা থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা রুজু হয়েছে। তদন্ত করছে ওড়িশা পুলিশও। ওড়িশা পুলিশের অনুমান, চোরাবালিতে তলিয়ে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটে। অভিনেতার মৃত্যুতে মুখ্যমন্ত্রী শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, রাহুলের এই হঠাৎ চলে যাওয়া বাংলার অভিনয় জগতের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কাও লেখেন, আমাদের জন্য গভীর শোক ও কঠিন সময় এটা।

রাহুল শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক অনুভূতির নাম। জ্যাকপট, লাভ সার্কাস, পিউপার মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় যেমন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে তেমনই ছোটপর্দায় হরগৌরী পাইস হোটেল, দেশের মাটি, তুমি আসবে বলে প্রতিটি চরিত্রে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করেছেন। সহজপাঠ বলে নিজস্ব একটা পডকাস্টও করতেন। সেই পডকাস্টের নাম দিয়েছিলেন নিজের ছেলের নামের মিল করেই সহজপাঠ। মঞ্চ, সিনেমা, টেলিভিশন সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি ছিল সহজ। আজ যখন এই খবরটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় তখন মনে পড়ে যায় সেই প্রথম ছবির কথা। যেখানে ভালোবাসা কখনও শেষ হয় না, শুধু রূপ বদলায়। হয়তো রাহুলও সেভাবেই থেকে যাবেন। একটা অসমাপ্ত সংলাপের মতো। যা শেষ না হলেও হৃদয়ে প্রতিধ্বনির মতো বাজতে থাকবে। কিছু মানুষ চলে যান না তাঁরা থেকে যান। থেকে যান পর্দার আলোয়, সংলাপের ভাঁজে আর সবচেয়ে বেশি থেকে যান মানুষের মনে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক তেমনই এক নাম যার গল্প থেমে গেলেও যার উপস্থিতি কখনও ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।