রামায়ণ দেখে কী বলছেন দর্শক?

একদিকে অযোধ্যার রাজপুত্র রাম! অন্যদিকে লঙ্কার মহাপরাক্রমশালী রাজা রাবণ! তাঁদের সংঘাতের কাহিনি ভারতীয়দের কাছে বহু পরিচিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মহাকাব্য শুনে, দেখে বড় হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু সেই চেনা কাহিনিকেই যখন বিশ্বমানের সিনেমার পর্দায় তুলে ধরার চ্যালেঞ্জ নিলেন বলিউডের নির্মাতারা, তখন প্রত্যাশার পারদ পৌঁছে গেল আকাশছোঁয়া উচ্চতায়!

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

৫ নভেম্বর মুক্তি পেয়েছে নীতেশ তিওয়ারি পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত ছবি ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’। রামের ভূমিকায় রণবীর কাপুর, সীতার চরিত্রে সাই পল্লবী এবং রাবণের ভূমিকায় যশ। সঙ্গে রয়েছেন সানি দেওল, রবি দুবে-সহ একঝাঁক তারকা।কিন্তু এত বড় আয়োজন, এত বিপুল প্রত্যাশা—শেষ পর্যন্ত দর্শকদের মন জয় করতে পারল কি রামায়ণ? নাকি চোখধাঁধানো দৃশ্যের আড়ালে কোথাও ফিকে হয়ে গেল গল্পের আবেগ?

প্রথমেই আসা যাক ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণে। তা হল এর ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশন!অযোধ্যা থেকে লঙ্কা, রাজপ্রাসাদ থেকে অরণ্য—প্রতিটি দৃশ্যেই বিশাল ক্যানভাস তৈরির চেষ্টা করেছেন নির্মাতারা। ভিএফএক্স, সেট এবং সিনেমাটোগ্রাফিতে আন্তর্জাতিক মানের ছাপ রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ছবির দৃশ্যায়ন ও বিশাল আয়োজনের প্রশংসা উঠে এসেছে। এমনকী কোথাও কোথাও তুলনা করা হয়েছে হলিউডের ‘লর্ড অফ দ্য রিংস’ কিংবা ‘অ্যাভাটার’-এর মতো ছবির সঙ্গে।অর্থাৎ ভারতীয় মহাকাব্যকে আন্তর্জাতিক সিনেমার ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টায় ছবিটি নজর কেড়েছে।

এবার আসা যাক অভিনয়ের কথায়।রামের চরিত্রে অভিনয় করা রণবীর কাপুরের সামনে ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। কারণ রাম শুধু সিনেমার একটি চরিত্র নন, কোটি কোটি মানুষের বিশ্বাস ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে তাঁর পরিচয়। রণবীরের সংযত অভিনয়, আবেগ এবং পর্দায় উপস্থিতি প্রশংসা পেয়েছে।সাই পল্লবীর সীতার চরিত্রও ছবির অন্যতম আকর্ষণ। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সম্ভবত যশকে ঘিরে। রাবণের রাজকীয় উপস্থিতি, ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় তাঁর প্রভাব দর্শকদের নজর কেড়েছে। অভিনয়ের পাশাপাশি বিশেষ প্রশংসা করা হয়েছে জটায়ুর সীতাকে রক্ষা করার দৃশ্যের।তবে প্রশংসার পাশাপাশি সমালোচনাও রয়েছে।

একাধিক সমালোচকের মতে, ছবির প্রথমার্ধের গতি কিছুটা ধীর। চরিত্রগুলির পরিচয় এবং প্রেক্ষাপট তৈরি করতে গিয়ে গল্পের গতি কোথাও যেন থমকে গিয়েছে।গান এবং আবহসংগীত নিয়েও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এ আর রহমান এবং হলিউডের বিখ্যাত সুরকার হ্যান্স জিমারের মতো দুই সুরকারের নাম জড়িয়ে থাকায় প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু দর্শকদের একাংশের মতে, সব জায়গায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।সোশ্যাল মিডিয়াতেও মিলেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ মুগ্ধ হয়েছেন দৃশ্যায়নে, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন গল্প বলার ধরন এবং অ্যাকশন দৃশ্য নিয়ে।অর্থাৎ বিশাল আয়োজন থাকলেও গল্পের আবেগ ও গতির প্রশ্নে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

এবার আসা যাক বক্স অফিসের অঙ্কে।সমালোচনা যাই থাকুক, মুক্তির প্রথম দিনেই নজরকাড়া শুরু করেছে ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’। বলিউড হাঙ্গামার ৬ নভেম্বরের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম দিনে ভারতের সব ভাষা মিলিয়ে ছবির আয় প্রায় ৬২ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা। এই আয়ের সুবাদে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ওপেনিং পাওয়া সিনেমার জায়গা করে নিয়েছে ছবিটি। অর্থাৎ প্রথম দিনেই ৫০ কোটির গণ্ডি পেরিয়ে গিয়েছে রামায়ণ।তবে প্রথম দিনের আয়ই শেষ কথা নয়। আগামী দিনগুলিতে দর্শকদের আগ্রহ কতটা বজায় থাকে, সেটাই এখন দেখার।কিন্তু সব কিছুর পরেও একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রামায়ণের মতো মহাকাব্যকে নতুন করে পর্দায় তুলে ধরতে গিয়ে নির্মাতারা কি তার মূল আবেগ এবং মর্যাদা বজায় রাখতে পেরেছেন?কারণ এই ছবির দর্শক শুধু সিনেমাপ্রেমী নন। তাঁদের অনেকের কাছেই রামায়ণ ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক আবেগের অংশ।

তাই এই ছবির বিচার শুধু ভিএফএক্স, অভিনয় কিংবা বক্স অফিসের অঙ্ক দিয়ে হবে না। বিচার হবে রামের মর্যাদা, সীতার ব্যক্তিত্ব এবং রাবণের জটিল চরিত্র কতটা যথাযথভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তার ভিত্তিতেও।আর মনে রাখতে হবে, এটি কাহিনির প্রথম পর্ব। ফলে সম্পূর্ণ গল্পের পরিণতি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী পর্বের।সব মিলিয়ে ‘রামায়ণ: পার্ট ওয়ান’ বিশাল আয়োজন, তারকাখচিত অভিনয় এবং চোখধাঁধানো দৃশ্যায়নে দর্শকদের নজর কেড়েছে। তবে গল্পের গতি ও সংগীত নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।প্রশ্ন একটাই—এই রামায়ণ কি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখবে? নাকি আকাশছোঁয়া প্রত্যাশার চাপেই কোথাও পিছিয়ে পড়বে?সেই উত্তর দেবে আগামী দিনের দর্শক, আর অবশ্যই বক্স অফিস!