এক সপ্তাহ পর বাড়ি ফিরেছেন জাহাঙ্গীর। এরইমধ্যে দুর্বল হয়েছে তৃণমূলের সংগঠন। দিকে দিকে গজিয়েছে পদ্ম।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : ভোট মিটেছে। ফলও স্পষ্ট। কিন্তু বাংলার রাজনীতিতে এখনও থামেনি লড়াই। কারণ এখনও বাকি কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ আসনের ভাগ্য নির্ধারণ। আর সেই তালিকায় সবচেয়ে বেশি চর্চায় এখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই কেন্দ্র। যেখানে একদিকে ২০৮ ছোঁয়ার লড়াই, অন্যদিকে সম্মান বাঁচানোর চেষ্টা। অপর দিকে ভবিষ্যতের নতুন রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা। এই কেন্দ্রকে ঘিরে এখন উত্তেজনা তুঙ্গে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরেও এখানে থামেনি বিতর্ক। বরং সময় যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে অভিযোগের পাহাড়। ইভিএমে কারচুপির অভিযোগ থেকে শুরু করে পুনর্নির্বাচনের দাবি। সব মিলিয়ে টানটান উত্তেজনার আবহ তৈরি হয় গোটা কেন্দ্রে। শেষ পর্যন্ত বিশেষ পর্যবেক্ষকের রিপোর্টের ভিত্তিতে গোটা ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। আর তারপর থেকেই ফলতাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্ক কষা।
গত ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল রাজ্যে দুদফায় বিধানসভা নির্বাচন হয়। দ্বিতীয় দফা ভোটের শুরু থেকেই উত্তপ্ত ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা। পুলিশ পর্যবেক্ষক বনাম তৃণমূল প্রার্থীর ঠান্ডা যুদ্ধ দেখা যায় সেখানে। ভোটের দিনেও দিনভর খবরের শিরোনামে ছিল ফলতা। ওই কেন্দ্রের একাধিক বুথে ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে। ১৭০ এবং ১৮৯ নম্বর বুথের ইভিএমে টেপ লাগানোর অভিযোগ উঠে আসে। শুধু ওই দুই বুথ নয়, আরও কয়েকটি বুথ থেকেও নানা অভিযোগ প্রকাশ্যে আসতে থাকে। বিরোধীরা ফলতার ৩২টি বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন। সেই সময় ওই বুথগুলিতে পুনর্নির্বাচন হবে কি না, তার স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পশ্চিমবঙ্গের ভোটের জন্য কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্তকে নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশমতো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে দিল্লিতে প্রস্তাব পাঠান বিশেষ পর্যবেক্ষক। গত ২ মে গোটা বিধানসভা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কমিশন।
একদিকে ২০৮ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি। সপ্তাহ দেড়েক আগে ২৯৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের গণনা হয়। ২০৭টি আসন পায় বিজেপি। ফলতায় জিততে পারলে আসন সংখ্যা বেড়ে ২০৮ হয়ে যাবে। আর সেজন্য কোনও খামতি রাখতে চায় না পদ্মশিবির। মঙ্গলবার বিধাননগরে বিজেপির দলীয় কার্যালয়ে প্রায় দুঘণ্টার বেশি সময় ধরে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী, সৌমিত্র খাঁ, শশী অগ্নিহোত্রী এবং জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো।
অন্যদিকে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান মঙ্গলবার অবশেষে ফেরেন নিজের বাড়ি। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির পর থেকে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে খোঁজ পাওয়া যায় না ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খানের। তারইমধ্যে তাঁর কার্যালয়ে চলে ভাঙচুর। কিন্তু তৃণমূল প্রার্থী নিখোঁজই ছিলেন। শেষপর্যন্ত অজয় পাল শর্মার বাহিনীর সহায়তায় ফলতায় ফিরে আসেন জাহাঙ্গীর। আগামী ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নিবার্চন হতে চলেছে। তার আগে নির্বাচন কমিশনের তরফে ডায়মন্ড হারবার পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে তৃণমূল প্রার্থী যেন ফলতায় ফিরে আসতে পারেন। আর নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নিবার্চনের জন্য যেন প্রচার করতে পারেন তৃণমূল প্রার্থী। তার পরে অবশেষে বাড়ি ফেরেন জাহাঙ্গীর।
কথাতেই আছে, আশায় বাঁচে চাষা। ঠিক সেই জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে ফলতার দিকে তাকিয়ে বামেরাও। দুবছর আগের লোকসভা ভোটের নিরিখে এবারের বিধানসভা ভোটে সামান্য ভোট সংখ্যা কমেছে বামেদের। তবে আসনের নিরিখে কমেছে শূন্যের গেরো। সেখান থেকেই ভবিষ্যতের জন্য আশায় বুক বাঁধা শুরু। ২০২১ সালে বিধানসভা ও ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে শূন্য হাতে ফেরার পর এবার সিপিএমকে জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। অন্যদিকে ভাঙড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের শওকত মোল্লাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য বিজয়ী আইএসএফের নওশাদ সিদ্দিকি। গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় প্রায় এক শতাংশ ভোট কমেছে সিপিএমের। এবারে তাদের ঝুলিতে গেছে ২৮ লক্ষ ৩৯ হাজার ৬৭ টি ভোট। যা ৪.৪৫ শতাংশ। ডোমকলের পাশেই জলঙ্গি কেন্দ্রে দ্বিতীয় স্থানে ছিল সিপিএম। ৪টি আসনে আইএসএফ রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ২২টি আসনে। এবারে জোটের পথে না হেঁটে একা লড়ে দুটি আসনে জয়ী কংগ্রেস। সিপিএমের থেকে কংগ্রেস বেশি আসন পেলেও তাদের বাক্সে পড়েছে ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার ৮৫৮টি ভোট।
বাংলায় এখনও পর্যন্ত সে আসন গুলির দিকে তাকিয়ে রাজনৈতিক দলগুলি, তা হল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে দেওয়া নন্দীগ্রাম ও হুমায়ুন কবীরের ছেড়ে দেওয়া রেজিনগর। আসন দুটিতে উপনির্বাচন হবে। এছাড়াও বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রেও রয়েছে উপনির্বাচনের সম্ভাবনা। এমন পরিস্থিতিতে নন্দীগ্রামটা নিজেদের হাতে রাখতে চায় বাম। বসিরহাট আইএসএফকে ছেড়ে ও রেজিনগরে কংগ্রেসকে প্রস্তাব দেওয়ার কথা চলছে। সমঝোতা নিয়ে সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠক ডাকা হয়েছে ১৬ ও ১৭ মে। এই তিন আসন নিয়ে বাংলায় ফের নয়া সমীকরণ শুরু হয়েছে।
তাই ফলতার লড়াই এখন আর শুধু একটা বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে আটকে নেই। এই লড়াইয়ে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার আগামী দিনের রাজনৈতিক সমীকরণও। বিজেপির কাছে এটা ২০৮-এর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। তৃণমূলের কাছে হারানো জমি ফিরে পাওয়ার শেষ চেষ্টা। আবার বাম-কংগ্রেস-আইএসএফের কাছে নিজেদের নতুন করে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করার মঞ্চ। আর সেই কারণেই ফলতার দিকে তাকিয়ে এখন গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। শুধু ফলতাই নয়, নন্দীগ্রাম, রেজিনগর থেকে সম্ভাব্য বসিরহাট উপনির্বাচন। সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতিতে ফের শুরু হয়েছে নতুন অঙ্ক কষা।