শনিবার মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের ১১টি বুথ এবং ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের ৪টি বুথে পুনর্নির্বাচন করা হচ্ছে।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দুই গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা কেন্দ্র—মগরাহাট পশ্চিম এবং ডায়মন্ড হারবার—নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরও বিতর্ক থামেনি, বরং নির্বাচন কমিশনের পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্তে সেই উত্তাপ আরও বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, এই দুই কেন্দ্রের মোট ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শনিবার সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই পুনর্নির্বাচন চলছে।
কমিশনের তরফে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের ১১টি বুথ এবং ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের ৪টি বুথে পুনর্নির্বাচন করা হচ্ছে। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তালিকায় ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের কোনও বুথের নাম এখনও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ এই ফলতা কেন্দ্র নিয়েই গত কয়েকদিন ধরে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক এবং অভিযোগ উঠে এসেছে।
বুধবার পশ্চিমবঙ্গের ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রে দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ হয়েছে। সেই দিন ডায়মন্ড হারবার এবং মগরাহাট পশ্চিমেও ভোট হয়। কিন্তু ভোটগ্রহণ চলাকালীন এবং তার পরবর্তী সময়ে একাধিক অভিযোগ জমা পড়ে কমিশনের কাছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এবং প্রতিনিধিরা দাবি করেন, বেশ কিছু বুথে অনিয়ম, ভয় দেখানো, এমনকি প্রযুক্তিগত কারচুপির ঘটনাও ঘটেছে। এই অভিযোগগুলির ভিত্তিতেই পুনর্নির্বাচনের দাবি জোরদার হয়।
এই পরিস্থিতিতে কমিশন বিষয়টি খতিয়ে দেখতে স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া শুরু করে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করেন সুব্রত গুপ্তকে। তাঁর দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট বুথগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা এবং রিপোর্ট জমা দেওয়া। সুব্রত গুপ্ত বিস্তারিত তদন্তের পর কমিশনের কাছে তাঁর রিপোর্ট পেশ করেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র। যদিও কমিশনের ঘোষিত তালিকায় ফলতার কোনও বুথের নাম নেই, সূত্রের খবর, সুব্রত গুপ্ত তাঁর প্রস্তাবে ফলতার প্রায় ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচনের সুপারিশ করেছিলেন। শুধু তাই নয়, রাজ্যের বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও একই দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, ফলতা কেন্দ্রের একাধিক বুথে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে এবং সেখানে পুনর্নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি।
শুভেন্দু অধিকারী শুক্রবার সাংবাদিক বৈঠকে বলেন, “ডায়মন্ড হারবারে ৪টি এবং মগরাহাটে ১১টি বুথে পুনর্নির্বাচন হচ্ছে। কিন্তু ডায়মন্ড হারবারে অন্তত ১৬টি বুথে সমস্যা ছিল। একইভাবে ফলতাতেও বহু বুথে অনিয়ম হয়েছে, সেগুলিও খতিয়ে দেখা উচিত।”
ফলতা কেন্দ্র নিয়ে বিতর্কের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, অভিযোগ উঠেছে যে কিছু বুথে ইভিএম মেশিনে ‘টেপ’ লাগানো হয়েছিল, যা ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ১৭০ এবং ১৮৯ নম্বর বুথে এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসে। এর ফলে ভোটারদের মধ্যে সন্দেহ এবং অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, আরও গুরুতর অভিযোগ হল, ফলতার একাধিক বুথে সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নেটওয়ার্ক সমস্যার অজুহাতে কন্ট্রোল রুমে সেই তথ্য পৌঁছয়নি। ফলে ওই সময়ে বুথের ভেতরে ঠিক কী ঘটেছে, তা স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। এই ঘটনাও পুনর্নির্বাচনের দাবিকে আরও জোরালো করেছে।
এছাড়াও ফলতায় কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা-কে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ, তিনি তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের বাড়ির কাছে গিয়ে হুমকি দিয়েছেন। যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে, তবুও তৃণমূলের তরফে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই ঘটনাও রাজনৈতিক চাপানউতোরকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কমিশন আপাতত ১৫টি বুথে পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিলেও, ফলতা কেন্দ্র নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, যদি তদন্তে আরও গুরুতর তথ্য সামনে আসে, তাহলে ভবিষ্যতে ফলতার কিছু বুথেও পুনর্নির্বাচনের ঘোষণা হতে পারে।
এখন নজর শনিবারের পুনর্নির্বাচনের দিকে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করা হবে। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং প্রতিটি বুথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যাতে কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন, সেই দিকেই বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পুনর্নির্বাচন শুধু ফলাফল নয়, বরং ভোটপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভোট নিয়ে প্রশ্ন উঠলে গণতন্ত্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যায়। তাই কমিশনের এই পদক্ষেপকে অনেকেই স্বাগত জানালেও, একই সঙ্গে আরও স্বচ্ছতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্তের দাবি উঠছে।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এই দুই কেন্দ্রকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার, শনিবারের পুনর্নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং ফলতা কেন্দ্র নিয়ে কমিশন ভবিষ্যতে কী সিদ্ধান্ত নেয়।