“যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি হবে তেল শোধনাগার”

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে চরম জ্বালানি সংকটের মধ্যেই নয়া ঘোষণা করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহ যত তীব্র হচ্ছে ততই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সঙ্কটের আশঙ্কা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্ন। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এই অস্থিরতার মধ্যেই বড় ঘোষণা করলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন বৃহৎ তৈল শোধনাগার তৈরি করা হবে। যা গত ৫০ বছরের মধ্যে আমেরিকার প্রথম নতুন রিফাইনারি। এই প্রকল্পে বড় বিনিয়োগ করতে চলেছে ভারতের শিল্পগোষ্ঠী রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিস। যার নেতৃত্বে রয়েছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি মুকেশ অম্বানী। ট্রাম্প জানান, ট্রেক্সাসের ব্রাউনসভিল বন্দরে এই নতুন তৈল শোধনাগারটি নির্মাণ করা হবে। তাঁর কথায়, গত ৫০ বছরে আমেরিকায় কোনও নতুন রিফাইনারি তৈরি হয়নি। ফলে এই প্রকল্পটি শুধু অর্থনৈতিক দিক থেকেই নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পে রিয়ায়েন্সের সঙ্গে প্রায় ৩০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছে বলে জানান তিনি। যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৭ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এই বিপুল বিনিয়োগকে ঐতিহাসিক চুক্তি বলেই উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, নতুন এই রিফাইনারি আমেরিকার জ্বালানি উৎপাদন বাড়াবে, শক্তিশালী করবে জাতীয় নিরাপত্তা ও তৈরি করবে বিপুল কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই প্রকল্পে আমেরিকার ফার্স্ট নীতি অনুসরণ করা হবে। অর্থাৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রথম সুযোগ পাবেন আমেরিকার নাগরিকরাই।

এদিকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যেই পড়তে শুরু করেছে বিশ্ববাজারে। বিশ্বের অধিকাংশ তেল উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিভিন্ন দেশে রফতানি হয় এবং এই সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হল হরমুজ প্রণালী। এই প্রণালীর এক পাশে রয়েছে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান। সামরিক উত্তেজনা বাড়তেই এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বহু তেলবাহী জাহাজ প্রণালীর আশপাশে আটকে পড়েছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল সরবরাহে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে জ্বালানির দামের উপর। যা অনেক দেশের অর্থনীতিতেই চাপ বাড়াচ্ছে। এই পরিস্থিতিতেই ভারতের ক্ষেত্রেও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে রিলায়্যান্স ইন্ডাস্ট্রিস। সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে, সরকারের নির্দেশিকা মেনে গুজরাতের জামনগর-এ অবস্থিত তাদের বিশাল রিফাইনারি থেকে এলপিজি উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জামনগরের এই রিফাইনারি বিশ্বের বৃহত্তর তৈল শোধনাগারগুলির মধ্যে অন্যতম। প্রতিদিন এখান থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা হয়। রাশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং আমেরিকা থেকে আমদানি করা তেল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

রিফাইনারি এবং পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সগুলিতে কর্মীরা দিনরাত কাজ করছেন যাতে দেশের বাজারে এলপিজি সরবরাহে কোনও ঘাটতি না পড়ে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরের KG-D6 BASIN থেকে উৎপাদিত প্রাকৃতিক গ্যাসও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরবরাহ করা হবে বলে জানানো হয়েছে। সংস্থার দাবি, সরকারের নীতি মেনেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকে। রিলায়েন্সের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও দেশের কোটি কোটি পরিবারের স্বার্থই তাদের কাছে সর্বাধিক গুরু্ত্বপূর্ণ। তাই বিশ্ববাজারে তেলের দামে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দেশের প্রয়োজন মেটাতে তারা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চালিয়ে যাবে। এই প্রেক্ষাপটেই নতুন রিফাইনারি প্রকল্প ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ যেন একটি বার্তা দিয়েছে পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতেও। সম্ভাব্য সংঙ্কট মোকাবিলায় কেন্দ্র সরকার ইতিমধ্যেই গ্যাসের যোগান নিয়ে বিশেষ নির্দেশিকা জারি করেছে। সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, গৃহস্থালি ব্যবহার এবং পাইপলাইনের রান্নার গ্যাসকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকারি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, পাইপলাইনের রান্নার গ্যাস, গৃহস্থলির এলপিজি ও যানবাহনে ব্যবহূত সিএনজি এই তিন ক্ষেত্রেই গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে সার কারখানা, চা শিল্প, সিটি গ্যাসের ব্যবহার কমানো হতে পারে। মূল লক্ষ্য একটাই দেশের সাধারণ মানুষের রান্নার গ্যাসের যোগানে যাতে কোনও ঘাটতি না পড়ে। যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দিতেই এ ব্যবস্থার ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। জ্বালানির দাম ও সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে হোটেল ও রেস্তোরাঁয়। রান্নার গ্যাসের খরচ বেড়ে গেলে অনেক ছোট রেস্তারাঁ ও খাবারের দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কিছু হোটেল রেস্তোরাঁ সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের সরবরাহে একাধিক নিয়ন্ত্রণের জেরে পাম্প ও অটোচালকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। অনেক চালক আশঙ্কা করছেন, যদি গ্যাসের দাম বাড়ে বা সরবরাহ কমে তাহলে অটোর ভাড়াও বাড়াতে হতে পারে। ফলে সাধারণ যাত্রীদের উপরও বাড়তি চাপ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে একধাক্কায় ৬০ টাকা। জোগানের আতঙ্কে দোকানের সামনে সিলিন্ডারের জন্য লম্বা লাইন লাগতে শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় দেশে রান্নার গ্যাসের জোগান অব্যাহত রাখথে জরুরি পণ্য আইন এসমা জারি করল কেন্দ্র।

তেল ও গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বহু দেশই চাপে পড়েছে। এর বড় প্রভাব পড়েছে পাকিস্তানে। জ্বালানির তীব্র ঘাটতি ও দাম বৃদ্ধির কারণে সেখানে কার্যত লকডাইন এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য দেশজুড়ে বিভিন্ন কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় স্কুল, সরকারি দফতর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাজের সময় কময়ে দেওয়া হয়েছে। পেট্রোল পাম্পের দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে এবং অনেক এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি পরিবহণ ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও তার প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যদি আরও বাড়ে এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা বজায় থাকে তবে পাকিস্তানের অর্থনীতির উপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি ব্যবহারে সংযম ও বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার দিকেই জোর দিচ্ছে সে পাকিস্তান সরকার।