বিতর্কে ‘রেন্ট ফ্রিজ প্ল্যান’

‘এই নীতির লক্ষ্য সাধারণ মানুষ, বিশেষত ভাড়াটিয়াদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। কারণ, নিউ ইয়র্কে ভাড়া এখন একেবারে আকাশছোঁয়া।’

সূচনা পল্ল্যে, প্রতিনিধি : নিউ ইয়র্ক- বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম শহর। এ এক স্বপ্নের শহর, কর্পোরেট রাজধানী, আর সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র। কিন্তু এই শহরেই এখন তীব্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে একজন মানুষ-ডেমোক্র্যাট নেতা জোহরান মামদানি। তিনি নিউ ইয়র্কের নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েই এনে ফেলেছেন এক বিশাল ঝড়-‘রেন্ট ফ্রিজ প্ল্যান’। সাধারণভাবে বলতে গেলে, ‘রেন্ট ফ্রিজ’ মানে হল- শহরের অ্যাপার্টমেন্টগুলির ভাড়া স্থির থাকবে, অর্থাৎ বাড়ির মালিকরা নতুন করে ভাড়া বাড়াতে পারবেন না। মামদানির বক্তব্য- এই নীতির লক্ষ্য সাধারণ মানুষ, বিশেষত ভাড়াটিয়াদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো। কারণ, নিউ ইয়র্কে ভাড়া এখন একেবারে আকাশছোঁয়া। অনেক পরিবার আয়ের অর্ধেকের বেশি খরচ করে ফেলছে কেবল থাকার জায়গার জন্য। তাই তিনি বলেছিলেন, যদি তিনি মেয়র হন, তবে তিনি চেষ্টা করবেন যেন নিউ ইয়র্কবাসীরা অন্তত মাথার উপরে ছাদ রাখার নিশ্চয়তা পান। কিন্তু, এই প্রস্তাবেই শুরু হয়েছে প্রবল সমালোচনা। সবচেয়ে তীব্র কণ্ঠে সরব হয়েছেন মার্কিন ধনকুবের ব্যারি স্টার্নলিখট, যিনি রিয়েল এস্টেট দুনিয়ার এক বড় নাম। তাঁর অভিযোগ, মামদানির এই পরিকল্পনা শহরের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে। স্টার্নলিখট এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি বলেছেন, মামদানি নিউ ইয়র্ক শহরকে মুম্বইয়ে পরিণত করতে চাইছেন! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন- মুম্বই! তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুম্বই শহরের আবাসন শিল্প ভুগছে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন, এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে। ফলে নতুন প্রকল্প শুরু করতে উদ্যোক্তারা ভয় পান।

স্টার্নলিখটের আশঙ্কা, “যদি নিউ ইয়র্কে রেন্ট ফ্রিজ কার্যকর হয়, তবে বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাবেন, নতুন প্রকল্প বন্ধ হবে, আর শহরের হাউজিং মার্কেট দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু মামদানির বক্তব্য একেবারেই আলাদা। তিনি মনে করেন, শহর যদি কেবল ধনীদের জন্য হয়, তবে সেটা আর শহর থাকে না- সেটা হয়ে ওঠে এক অমোঘ বিভাজনের প্রতীক। তাঁর ভাষায়- “আমি এমন এক নিউ ইয়র্ক চাই যেখানে শিক্ষক, ট্যাক্সি ড্রাইভার, নার্স, ছোট ব্যবসায়ী- সবাই থাকতে পারেন। যেখানে ভাড়ার ভয় মানুষকে শহর ছেড়ে পালাতে বাধ্য করবে না।

তবে ব্যারি স্টার্নলিখট এখানেই থামেননি। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, “অতি বামপন্থীরা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, তারা বলছে ভাড়াটেদের টাকা দিতে হবে না, তবুও তাদের কেউ ঘরছাড়া করতে পারবে না! এটা সম্পূর্ণ পাগলামি!” আর এখানেই আসে তাঁর সবচেয়ে কটাক্ষপূর্ণ মন্তব্য- “দেখাদেখি অন্য ভাড়াটিয়ারাও ভাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেবেন। আর তারপর আপনি মূলত নিউ ইয়র্ক শহরকে মুম্বইয়ে পরিণত করতে চলেছেন!

এই মন্তব্যে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষোভ ছড়িয়েছে নিউ ইয়র্কের বাম ও প্রগতিশীল মহলে। অনেকেই বলেছেন, ব্যারি স্টার্নলিখটের মন্তব্যে লুকিয়ে আছে শ্রেণিবিভাজনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। কারণ, মুম্বই বা নিউ ইয়র্ক- দুই শহরেই একই সমস্যা। একদিকে বিলাসবহুল টাওয়ার, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মাথার উপরে ছাদ রাখার সংগ্রাম।

উল্লেখ্য, জোহরান মামদানি শুধু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নন- তিনি Democratic Socialists of America (DSA) দলের সদস্য। এই দলটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বামঘেঁষা নীতির পক্ষে পরিচিত।

তাই তাঁর এই রেন্ট ফ্রিজ প্রস্তাব অনেকের কাছেই এক আশার প্রতীক। কেউ বলছেন- এটি ধনীদের বিরুদ্ধে মধ্যবিত্ত ও গরিবদের রক্ষার পদক্ষেপ, আবার অন্যেরা বলছেন- এটি বিনিয়োগ ও নির্মাণ শিল্পের জন্য এক ‘বিপজ্জনক এক্সপেরিমেন্ট’।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, “মামদানির এই পদক্ষেপ একদিকে সামাজিক ন্যায়বিচারের দিক থেকে প্রয়োজনীয়, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে খুবই কঠিন।”

কারণ, ভাড়া স্থির রাখলে একদিকে ভাড়াটিয়ারা স্বস্তি পাবেন, কিন্তু বাড়ির মালিকরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাতে পারেন। ফলে নতুন বাড়ি নির্মাণ কমে যাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে শহরের হাউজিং সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

তবে এর মধ্যেও এক প্রতীকী দিক আছে- একজন তরুণ, বাঙালি বংশোদ্ভূত আমেরিকান রাজনীতিক, যিনি পুঁজিবাদের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে বলছেন, “আর্থিক নীতি নয়, মানবিক নীতি আগে।” এই বক্তব্যের মধ্যে যেন লুকিয়ে আছে নতুন প্রজন্মের এক প্রতিবাদ, এক বিকল্প চিন্তার সুর।

নিউ ইয়র্ক আজ এক নতুন অধ্যায়ের শুরু দেখছে। জোহরান মামদানির ‘রেন্ট ফ্রিজ প্ল্যান’ কার্যকর হলে শহরের ভবিষ্যৎ কী হবে- তা এখন সময়ই বলবে। কিন্তু এই বিতর্ক নিশ্চিতভাবেই বিশ্বজুড়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে- বাসস্থান কি ব্যবসা, নাকি মৌলিক অধিকার? এবং এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দিনের নিউ ইয়র্ক- আর হয়তো গোটা বিশ্বের নগর রাজনীতির ভবিষ্যৎও।