বাঙালি মেয়ের হাতে ‘বিশ্বকাপ’

“জীবন বাজি রেখে নেমেছিলাম ফাইনালে, বিশ্বকাপ জিতে সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে।”

রিয়া দাস, সাংবাদিক: বিশ্বকাপ জয়। এই শব্দ দুটি আজ ভারতবাসীর হৃদয়ে এক নতুন আলো জ্বেলে দিয়েছে। বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল আজ বিশ্বজয়ী। আর এই ঐতিহাসিক জয়ের নায়িকা শিলিগুড়ির মেয়ে রিচা ঘোষ। একসময় যে মেয়েকে নিয়ে কটাক্ষ, সমালোচনা , এমনকি সন্দেহ করা হয়েছিল। আজ সেই রিচাই লিখে দিলের ভারতের গৌরবের নতুন অধ্যায়।

সৌরভ গাঙ্গুলি, ঝুলন গোস্বামী পারেনি। সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতীয় ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। ঝুলন গোস্বামী দেখিয়েছিলেন মহিলাদের ক্রিকেটেও কতটা জেদ ও প্রতিভা লুকিয়ে আছে। কিন্তু তাঁদের হাত ধরে আসেনি বিশ্বকাপ। রিচা ঘোষ পারলেন। শিলিগুড়ির মেয়ের হাতে এল বাঙালি প্রথমবার ক্রিকেট বিশ্বকাপ। রিচা ও তাঁর সহযোদ্ধারা আজ তা সম্ভব করে দেখালেন। যা একসময় শুধুই স্বপ্ন ছিল। যারা এক সময় বলেছিলেন মহিলা ক্রিকেটে আগ্রহ নেই, তাদের মুখে আজ জয়ের হাসি ফুটিয়ে দিয়েছেন ভারতের মহিলারা। এই জয়ের অন্যতম নায়িকা রিচা। তাঁর অনবদ্য ব্যাটিং পারফরম্যান্সই ভারত পৌঁছে যায় জয়ের দুয়ারে।  রবিবার দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ফাইনালে রিচার ৩৪ রান গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।

ম্যাচের শেষে রিচা জানিয়েছেন,

“জীবন বাজি রেখে নেমেছিলাম ফাইনালে

বিশ্বকাপ জিতে সেই স্বপ্নপূরণ হয়েছে

“নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম

নিজের মধ্যে যা আছে পুরোটা উজাড় করে দিতে হবে

একে অপরের জন্য খেলব আমরা

সব উজাড় করে দাও, এটাই ছিল মূল মন্ত্র

বিশ্বকাপ জয় আমাদের কাছে স্বপ্নপূরণ

আমরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

এই অনুভূকি বাকি সব কিছুর চেয়ে আলাদা”

   এই জয় শুধু একটি ম্যাচের নয়, এটি এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল। বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব অনেকটাই প্রাপ্রয কোচ অমলের। গত দুবছরে মহিলা দলকে অনেকটাই বদলে দিয়েছেন তিনি। দেশের হয়ে তিনি একটি ম্যাচও খেলনি। অথচ কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতে ফেললেন। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েই শেষ হাসি হেসে ফেলেন হরমনপ্রীত বাহিনী। রিচা ঘোষের পারফরম্যান্স ছিল পুরো টুর্নামেন্টেই চোখে পড়ার মতো। টপ অর্ডারে নেমে তিনি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রান করেছেন। দলের জন্য বড় ভূমিকা নিয়েছেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে রিচা ২৪ বলে ৩৪ রান করেন

৩টে বাউন্ডারি ও দুটি ছক্কাও করেন তিনি

উইকেটের পিছনে একটি ভাল ক্যাচও ধরেন এই উইকেটরক্ষক

রিচা ঘোষের এটিই প্রথম বিশ্বকাপ

এই প্রতিযোগিতায় আট ইনিংসে মোট ২৩৫ রান করেন তিনি

চাপের মুহূর্তে তাঁর ব্যাট থেকে আসা প্রতিটি রানই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। শেষ দশ ওভারে রিচার ব্যাটিং ভারতের স্কোরবোর্ডে গতি এনে দেয়। যা শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি সমাজের চোখে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করাও যে কতটা কঠিন ছিল, তা জানেন প্রতিটা মহিলা ক্রিকেটার।  কিন্তু সমস্ত বাধা, কটুক্তি আর অবহেলাকে পেছনে ফেলে আজ তারা প্রমাণ করলেন- “গড ইজ অ্যা ওম্যান’। প্রতিভা, আত্মবিশ্বাস থাকলে কিছুই অসম্ভব নয় সেই কথারই রবিবার সাক্ষি থাকলেন গোটা ভারতবাসী। যে রাঁধে সে চলুও বাঁধে এককথায় সমালোচকদের জবাব দিলেন ভারতের মেয়েরা।

আজ শিলিগুড়ি শহর উৎসবের আবহে। রিচার বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়, বাজছে ঢাক, উড়ছে তিরঙ্গা। ছোটবেলায় যিনি ব্যাট হাতে মাঠে নামলে অনেকে হেসে বলত ছেলেদের খেলা। আজ সেই রিচাই প্রমাণ করলেন। প্রতিভা আর পরিশ্রমের কোনও লিঙ্গ নেই। রিচা ঘোষ আজ শুধু ক্রিকেটার নন, তিনি এক অনুপ্রেরণা। এটাই নতুন ভারতের পরিচয় যেখানে রিচার ছক্কা মানেই দেশের গর্ব।

রিচা আজ শুধু শিলিগুড়ির নয়, গোটা ভারতের গর্ব। এই জয় কেবল একটি ট্রফি নয়। এটি একটি প্রজন্মের প্রেরণা। যারা রিচার মতো স্বপ্ন দেখে, সাহস করে, আর নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করে।