ধারাবাহিক হোক কিংবা সিনেমা। টলিউডে এখন প্রশ্নের মুখে কলাকুশলীদের নিরাপত্তা। রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে ঘুরে-ফিরে উঠছে এই প্রসঙ্গ।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : ধারাবাহিক, সিরিজ কিংবা সিনেমা- একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীর নিরাপত্তার দায় নেওয়া উচিত প্রযোজনা সংস্থার এবং পরিচালকের। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় বড় পদক্ষেপ নিল টলিপাড়া। মঙ্গলবার থেকে কর্মবিরতির ঘোষণা করা হল অনির্দিষ্টকালের জন্য। রবিবার বিকেলে টেকনিশিয়ানস স্টুডিওতে বসেছিল এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আর্টিস্ট ফোরামের প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, যিশু সেনগুপ্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, চিরঞ্জিৎ, অঞ্জনা বসু, রূপাঞ্জনা মিত্রের মতো তারকারা।
ফেডারেশনের সঙ্গে আর্টিস্ট ফোরামের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি ফোরামের জেনারেল সেক্রেটারি শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “যাঁদের হাতে সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে, তাঁরা যতক্ষণ না নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন ততক্ষণ কর্মবিরতি চলবে। আর্টিস্ট ফোরামের চার হাজার সদস্য, ফেডারেশনের সাত হাজার টেকনিশিয়ান এবং সকল কলাকুশলী মিলে এই সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে। আমরা যাঁরা শিল্পী তাঁদের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। শুটিংয়ে বেরিয়ে ফিরতে পারব কি না সেটা বুঝতে পারি না। রাহুল আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত।”
অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় সহমত পোষণ করে জানান, রাহুলের মৃত্যু শুটিংয়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন তুলে দিয়ে গেল। ওর এইভাবে চলে যাওয়াটা তো কাম্য ছিল না। রাহুলের মৃত্যু ইন্ডাস্ট্রির সমস্ত ভেদাভেদ সরিয়ে দিল। ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা বলেন, রাহুলের মৃত্যু আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। ও আমাদের একজোট করে চলে গেল।
গত ২৯ মার্চ ওড়িশার তালসারিতে ‘ভোলবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং চলাকালীন সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সহ-অভিনেত্রী ফিরলেও, ফেরেননি রাহুল। একটি শুটিং সেট কীভাবে মৃত্যুর মঞ্চ হয়ে উঠল, সেই প্রশ্নই এখন তাড়া করছে সিনেপ্রেমীদের। অভিনেতার মৃত্যুর পেছনে অবহেলার অভিযোগ তুলে শনিবার দুপুরে কলকাতার রিজেন্ট পার্ক থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে ‘আর্টিস্ট ফোরাম’। অভিযুক্ত করা হয়েছে চিত্রনাট্যকার লীনা গাঙ্গুলীর প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-কে।

শনিবার বিকেলে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানান টালিপাড়ার একঝাঁক তারকা। এরপরই থানায় হাজির হন প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জি, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও চিরঞ্জিত চক্রবর্তীসহ অনেক শিল্পীরা। রাহুলের স্ত্রী অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারও তাদের সঙ্গে ছিলেন। প্রযোজক-প্রযোজনা সংস্থার অবহেলার কারণে স্বামীর অকালমৃত্যুকে মেনে নেননি অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারও। শনিবার কলকাতায় রিজেন্ট পার্ক থানায় সংশ্লিষ্ট প্রযোজনা সংস্থার বিরুদ্ধে তিনিও এফআইআর দায়ের করেন। এরপর মাঝ রাতেই তিনি চলে যান তালসারিতে। সেখানেই রাহুলের মৃত্যুতে দ্বিতীয় অভিযোগ দায়ের হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৬ (১), ২৪০ ও ৩(৫) তিন ধারায় মামলা হয়েছে। প্রযোজনা সংস্থার কর্ণধার শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ছাড়াও পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল, ফ্লোর এগজিকিউটিভ প্রোডিউসার শান্তনু নন্দী, ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগে প্রিয়াঙ্কা জানিয়েছেন, শ্যুটিং করার আগে কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই বিপজ্জনকভাবে শ্যুট চলছিল। এই গাফিলতির কারণেই অভিনেতার মৃত্যু হয়। মিথ্যা তথ্যপ্রচার, অপরাধ মূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগও এনেছেন রাহুলপত্নী। কারণ ঘটনার পর প্রযোজনা সংস্থার তরফে একাধিক বয়ান সামনে এসেছিল। যার জেরে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আরজি জানিয়েছেন তিনি। কেন অভিযোগ জানাতে দেরি, অভিযোগপত্রে সে প্রসঙ্গে প্রিয়াঙ্কা লিখেছেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। ফলে অভিযোগ জানাতে বিলম্ব হল।’ প্রিয়াঙ্কার অভিযোগের ভিত্তিতে শুরু হয়েছে তদন্ত।
তবে শুধু আইনি লড়াই নয়, কাজের পরিবেশ বদলাতে অনড় টলিপাড়া। ফোরামের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে-প্রতিটি শুটিং ফ্লোর বা লোকেশনে বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাম্বুল্যান্স রাখতে হবে। আউটডোর শুটিংয়ের ক্ষেত্রে জীবনের ঝুঁকি কমাতে কড়া নিরাপত্তা বিধি মানতে হবে। শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের মর্যাদার সাথে সাথে সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে হবে প্রযোজকদের।
অভিনেতার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে বর্তমানে টালিউডে শোক ও উত্তেজনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুটিং বন্ধ থাকলে বাংলা মেগা সিরিয়ালগুলো সবথেকে বেশি সমস্যায় পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। যে সব ধারাবাহিকের ‘এপিসোড ব্যাঙ্কিং’ বা আগাম শুটিং করা নেই, সেগুলোর সম্প্রচার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে অভিনেতা রাহুলের মৃত্য়ু টলিউডের কলাকুশলীদের নিরারত্তার ক্ষেত্রে নতুন পথ দেখিয়েছে বলে মত সিনেপ্রেমীদের।