জি মিডিয়ার মূল সংস্থা এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্রের ২২ হাজার ৬ কোটি টাকার বেশি বকেয়া ঋণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ।

আর প্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ! আর সেই বিপুল বকেয়া মিটিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব- মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকায়! সংখ্যাটা শুনলেই প্রশ্ন উঠবে, এত বিপুল ঋণের দায় কীভাবে এত অল্প টাকায় মিটে গেল? আরও বড় প্রশ্ন- এই ঋণ মকুবের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে সুভাষ চন্দ্রের পরিবারের ঘনিষ্ঠ সংস্থাগুলির ভূমিকা কতটা ছিল? এই প্রশ্ন ঘিরেই এখন তীব্র বিতর্ক। শিল্পপতি তথা জি মিডিয়ার মূল সংস্থা এসেল গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান সুভাষ চন্দ্রের ২২ হাজার ৬ কোটি টাকার বেশি বকেয়া ঋণ নিয়ে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইবুনাল বা এনসিএলটি-র সিদ্ধান্তের পর নতুন করে সামনে এসেছে একাধিক গুরুতর অভিযোগ। ঋণদাতাদের একাংশের দাবি, সুভাষ চন্দ্রের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ পাঁচটি সংস্থার ভোটেই তাঁর ঋণের ৯৯ শতাংশের বেশি মকুবের রাস্তা পরিষ্কার হয়েছে। আর এখানেই উঠছে ফরেন্সিক অডিটের প্রশ্ন। কারণ শুধু এই প্রশ্ন নয় যে, কত টাকা ঋণ ছিল এবং কত টাকা ফেরত দেওয়া হল। প্রশ্ন আরও গভীর- ঋণ মকুবের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ভোটদানের অধিকার কার ছিল? কোন সংস্থা কতটা ভোট দিয়েছিল? সেই সংস্থাগুলির সঙ্গে ঋণগ্রহীতার সম্পর্ক কী? তাঁদের কি এই ভোটে অংশ নেওয়ার অধিকার ছিল? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- এই বিপুল ঋণের টাকা কোথায় গিয়েছিল? কীভাবে তৈরি হয়েছিল এত বড় ঋণের বোঝা?
সুভাষ চন্দ্রের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে ঋণের দায় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আইনি প্রক্রিয়া চলছিল। দেউলিয়া আইনের আওতায় তাঁর সম্পদ এবং পরিশোধের ক্ষমতা বিবেচনা করে একটি রিপেমেন্ট বা সেটেলমেন্ট প্রস্তাব সামনে আসে। সেই প্রস্তাবে বলা হয়, ব্যক্তিগত সম্পত্তি থেকে তিনি সর্বোচ্চ প্রায় ৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা দিতে পারবেন। অন্যদিকে বকেয়া ঋণের অঙ্ক ২২ হাজার ৬ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, মোট বকেয়ার তুলনায় ফেরত দেওয়ার প্রস্তাবিত অর্থ অত্যন্ত সামান্য। ঋণদাতাদের একটি বড় অংশ এই প্রস্তাবে সায় দেয়। প্রায় ৮০.৮১ শতাংশ ভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয় বলে ট্রাইবুনালের নথিতে উঠে এসেছে। কিন্তু এখানেই আপত্তি। কিছু ঋণদাতার দাবি- এই ভোটের বড় অংশ এসেছে এমন পাঁচটি সংস্থার কাছ থেকে, যেগুলি সুভাষ চন্দ্রের পরিবারের ঘনিষ্ঠ বা অ্যাসোসিয়েট সংস্থা হিসেবে চিহ্নিত। ঋণদাতাদের অভিযোগ, ওই পাঁচ সংস্থার হাতে মিলিয়ে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রায় ৬১.৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, তাঁরা ভোট দিতে না পারলে পুরো হিসাবটাই বদলে যেতে পারত।
এবার আসছে আসল প্রশ্ন- ফরেন্সিক অডিট কেন জরুরি?
ফরেন্সিক অডিট সাধারণ অডিটের মতো শুধু হিসাবের খাতা মিলিয়ে দেখে না। এর লক্ষ্য হল- টাকার গতিপথ খুঁজে বের করা। কোন সংস্থা থেকে কোন সংস্থায় টাকা গিয়েছে? কোন সময়ে গিয়েছে? কেন গিয়েছে? ঋণের টাকা কি নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার হয়েছিল? নাকি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির মধ্যে টাকা ঘোরানো হয়েছিল? কোনও সম্পদ কি কম দামে অন্য সংস্থায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল? কোনও সম্পর্কিত পক্ষকে সুবিধা দেওয়া হয়েছিল কি না? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ- ঋণগ্রহীতার আর্থিক সমস্যার পিছনে কোনও বেআইনি লেনদেন, অর্থ সরানো বা পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের ভূমিকা ছিল কি না? এই প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এত বড় অঙ্কের ঋণ কীভাবে তৈরি হল, তা পুরোপুরি বোঝা কঠিন।
পাঁচটি সংস্থার ভোট নিয়ে বিতর্ক কেন?
ধরুন, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী একটি বড় অঙ্কের ঋণ নিয়েছে। এরপর সেই ঋণের পুনর্গঠন বা নিষ্পত্তির প্রস্তাব নিয়ে ভোট হচ্ছে। এখন যদি ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কোনও সংস্থার হাতে সেই ভোটের বড় অংশ থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে- তাঁদের স্বার্থের সংঘাত বা conflict of interest ছিল কি না? ঋণদাতাদের একাংশ ঠিক এই যুক্তিই সামনে এনেছে। এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক, আইডিবিআই ট্রাস্টিশিপ সার্ভিসেস-সহ কয়েকটি সংস্থা দাবি করেছিল, ওই পাঁচটি সংস্থাকে ভোটে অংশ নিতে দেওয়া উচিত নয়। তাদের বক্তব্য ছিল, ওই সংস্থাগুলির হাতে উল্লেখযোগ্য ভোটক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই আপত্তি খারিজ করে এনসিএলটি-র বেঞ্চের তৃতীয় সদস্য নীলেশ শর্মা প্রস্তাবের পক্ষে রায় দেন। এরপর দেখা যায়, ওই পাঁচ সংস্থার ভোটসহ সামগ্রিকভাবে ৮০.৮১ শতাংশ ভোটে প্রস্তাবটি পাশ হয়েছে। এখানেই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
তাহলে ফরেন্সিক অডিটে কী কী খতিয়ে দেখা দরকার?
প্রথমত- ঋণের উৎস। কোন ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান কত টাকা ঋণ দিয়েছিল? কোন সময় সেই টাকা দেওয়া হয়েছিল? কোন সম্পদের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়া হয়েছিল? কী ধরনের গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি ছিল? দ্বিতীয়ত- ঋণের ব্যবহার। ঋণের টাকা যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল, সত্যিই কি সেই কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল? নাকি এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় টাকা স্থানান্তর করা হয়েছিল? তৃতীয়ত- রিলেটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন। অর্থাৎ, সুভাষ চন্দ্র বা তাঁর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত সংস্থাগুলির মধ্যে কোনও আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না। চতুর্থত- সম্পদের মূল্যায়ন। যে সম্পদগুলির বিনিময়ে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলির প্রকৃত বাজারমূল্য কত ছিল? কোনও সম্পদ কি ইচ্ছাকৃতভাবে কম দামে বিক্রি করা হয়েছিল? পঞ্চমত- ভোটিং স্ট্রাকচার। এই পাঁচটি সংস্থা কীভাবে ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ভোট দেওয়ার অধিকার পেল? তাদের প্রকৃত মালিকানা কাঠামো কী? কারা সেই সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে? এবং তাঁদের সঙ্গে সুভাষ চন্দ্রের ব্যবসায়িক সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
একটা উদাহরণেই বোঝা যাক
ধরা যাক, কোনও ব্যক্তির কাছে ১০০ টাকা পাওনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঋণদাতারা মাত্র ১ টাকা নিয়ে বাকি ৯৯ টাকা ছেড়ে দিলেন। আইন যদি সেই পরিস্থিতিতে এমন নিষ্পত্তির অনুমতি দেয়, তাহলে সেটি নিজে থেকেই বেআইনি হয়ে যায় না। দেউলিয়া আইনে অনেক ক্ষেত্রেই ঋণদাতারা বুঝতে পারেন- পুরো টাকা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত কিছু টাকা উদ্ধার করে মামলা শেষ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এটাই মূলত হেয়ারকাট। কিন্তু প্রশ্ন তখনই ওঠে, যখন হেয়ারকাটের অঙ্ক অত্যন্ত বেশি হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ সামনে আসে। সুভাষ চন্দ্রের ক্ষেত্রে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু তাই শুধু ২২ হাজার কোটি টাকা বনাম ৬.৫ কোটি টাকা নয়। বরং- এই ৬.৫ কোটির সেটেলমেন্ট কীভাবে সম্ভব হল? এবং যাঁদের ভোটে এই প্রস্তাব পাশ হল, তাঁদের সঙ্গে ঋণগ্রহীতার সম্পর্ক কী? ঋণদাতারা কেন আপিল করতে চাইছেন? এলআইসি হাউজিং ফিনান্স, কানাড়া ব্যাঙ্ক, ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক-সহ একাধিক ঋণদাতা এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা এত বড় অঙ্কের বকেয়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন। এই কারণে উচ্চতর আপিল আদালতে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে কয়েকটি ঋণদাতা সংস্থা। অর্থাৎ, এই বিতর্ক এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আরও পরিষ্কার হতে পারে- এনসিএলটি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি আইনগত এবং প্রক্রিয়াগতভাবে কতটা সঠিক ছিল।
আর সাধারণ মানুষের প্রশ্নটা কী?
ব্যাঙ্কে সাধারণ মানুষ ৫ লক্ষ, ১০ লক্ষ বা ২০ লক্ষ টাকার ঋণ নেন। কিস্তি সময়মতো দিতে না পারলে নোটিস আসে। বাড়ি বা সম্পত্তি বন্ধক থাকলে সেটি বাজেয়াপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ব্যবসার জন্য নেওয়া ঋণ ফেরত দিতে না পারলে ছোট ব্যবসায়ীকে চরম আর্থিক সমস্যার মুখে পড়তে হয়। তাহলে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে যদি বিপুল পরিমাণ টাকা শেষ পর্যন্ত মকুব হয়ে যায়, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক- ব্যাঙ্কের টাকা আসলে কার? ব্যাঙ্কের টাকা তো শেষ পর্যন্ত আমানতকারীদেরও টাকা। তাই বড় ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানেও একটা বিষয় পরিষ্কার রাখা দরকার। সুভাষ চন্দ্রের ক্ষেত্রে এনসিএলটি যে নিষ্পত্তির অনুমোদন দিয়েছে, তা থেকে সরাসরি বলা যায় না যে তিনি বেআইনিভাবে ঋণের টাকা সরিয়েছেন বা কোনও অপরাধ করেছেন। এমন কোনও অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে- এমন দাবিও করা উচিত নয়। বরং যে প্রশ্নগুলি উঠছে, সেগুলির উত্তর পাওয়ার জন্যই দরকার নথি যাচাই, স্বাধীন তদন্ত এবং প্রয়োজনে ফরেন্সিক অডিট। কারণ অভিযোগ আর প্রমাণ- দুটো এক জিনিস নয়।
২২ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া। তার বিপরীতে মাত্র সাড়ে ৬ কোটি টাকা। আর সেই প্রস্তাব পাশ করার ভোটে ৬১.৭৪ শতাংশ ক্ষমতা থাকা পাঁচটি ঘনিষ্ঠ সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন। এই তিনটি তথ্যই গোটা ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এখন নজর থাকবে উচ্চতর আদালতের দিকে। নজর থাকবে ঋণদাতাদের আপত্তির দিকে। আর সবচেয়ে বড় কথা- এই ঋণের সম্পূর্ণ আর্থিক ইতিহাস কি কোনওদিন ফরেন্সিক অডিটের মাধ্যমে সামনে আসবে? কারণ একটি বড় ঋণ মকুব করা হয়েছে কি না, শুধু সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ- কেন এত বড় ঋণ তৈরি হল, সেই টাকা কোথায় গেল, কারা লাভবান হল এবং শেষ পর্যন্ত তার বোঝা কে বহন করল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর যতক্ষণ না সামনে আসছে, ততক্ষণ সুভাষ চন্দ্রের ঋণ মকুবের বিতর্কও থামবে না।