পাতে খাবার, নাকি বিপদ?

হাসপাতাল চত্বরে ফুড সেফটি অভিযানে বন্ধ একাধিক দোকান।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা : ডায়মন্ড হারবার জেলা হাসপাতাল চত্বর সংলগ্ন এলাকায় খাবারের দোকানগুলিতে আচমকা অভিযান চালাল ডায়মন্ড হারবার পৌরসভার ফুড সেফটি বিভাগ। হাসপাতালের সামনে এবং আশপাশের এলাকায় থাকা একাধিক খাবারের দোকানে হানা দিয়ে খাবারের গুণমান, পরিচ্ছন্নতা এবং খাবার পরিবেশনের পদ্ধতি খতিয়ে দেখা হয়। অভিযানে বেশ কিছু দোকানে খাবার তৈরির পরিবেশ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে বলে অভিযোগ। এরপরই কয়েকটি দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি অন্যান্য দোকানদারদেরও সতর্ক ও সচেতন করা হয়।
জেলা হাসপাতাল চত্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। প্রতিদিন চিকিৎসার জন্য বহু মানুষ হাসপাতালে আসেন। রোগী এবং তাঁদের পরিজনদের কথা মাথায় রেখে হাসপাতালের আশপাশে খাবারের দোকানগুলিতে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু অভিযোগ, হাসপাতাল সংলগ্ন বেশ কিছু দোকানে দীর্ঘদিন ধরেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হচ্ছিল। কোথাও খাবার ঢেকে রাখা হচ্ছে না, কোথাও আবার রান্নার জায়গার পরিচ্ছন্নতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছিল। এমন অভিযোগ সামনে আসার পরই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় পৌরসভার ফুড সেফটি বিভাগ।
অভিযানের সময় দোকানে রাখা বিভিন্ন খাবার খতিয়ে দেখার পাশাপাশি খাবার তৈরির জায়গা, রান্নার সামগ্রী, খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং দোকানের সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষা করা হয়। খাবার কতটা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে তৈরি হচ্ছে, তা নিয়েও নজর দেন আধিকারিকরা। অভিযোগ, কয়েকটি দোকানে এমন কিছু খাবার পরিবেশন করা হচ্ছিল, যেগুলির মান এবং স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এরপরই নিয়ম না মানা কয়েকটি দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে জানা গিয়েছে। একইসঙ্গে যেসব দোকানে তুলনামূলকভাবে কম সমস্যা পাওয়া গিয়েছে, সেই দোকানগুলির ব্যবসায়ীদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়। খাবার ঢেকে রাখা, পরিষ্কার জায়গায় রান্না করা, বাসি বা দীর্ঘক্ষণ রাখা খাবার পরিবেশন না করা এবং খাবার তৈরিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সচেতন করা হয়।
ফুড সেফটি আধিকারিকদের এই অভিযান ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই চাঞ্চল্য ছড়ায় হাসপাতাল চত্বরে। অভিযান চলাকালীন বেশ কয়েকজন দোকানদারকে সতর্ক করা হয়। তাঁদের জানানো হয়, মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনওরকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। বিশেষ করে হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল এলাকার সামনে খাবারের দোকান চালানোর ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধির উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

ডায়মন্ড হারবার পৌরসভার ফুড সেফটি অফিসার ডক্টর মুকুলিকা বাগচী জানান, হাসপাতাল চত্বর এবং সংলগ্ন এলাকায় খাবারের দোকানগুলিতে খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা খতিয়ে দেখতে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

পৌরসভার পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, শুধুমাত্র অভিযান চালিয়ে দোকান বন্ধ করে দেওয়াই উদ্দেশ্য নয়। ব্যবসায়ীদের সচেতন করাও এই অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য। কারণ খাবারের সঙ্গে সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য জড়িত। নিম্নমানের বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন সাধারণ মানুষ। আর হাসপাতাল চত্বরে এমন ঘটনা আরও উদ্বেগজনক বলে মনে করছে প্রশাসন।

বিশেষ করে রোগীর পরিজনদের একটা বড় অংশ হাসপাতালের বাইরে থাকা দোকানগুলির উপর নির্ভর করেন। দীর্ঘক্ষণ হাসপাতালে থাকার কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই দোকানগুলি থেকে খাবার কিনে খান। ফলে সেই খাবারের মান নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের উপর।

এদিনের অভিযানে যেসব দোকানে অনিয়ম বা স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, সেগুলির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হয়েছে। একইসঙ্গে অন্য দোকানগুলিকেও সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে খাবারের মান বা পরিচ্ছন্নতা নিয়ে কোনও অভিযোগ না ওঠে।

পৌরসভার ফুড সেফটি বিভাগের এই অভিযান আগামী দিনেও চলবে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে। তবে হাসপাতাল চত্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় খাবারের দোকানগুলিতে নিয়মিত নজরদারি থাকলে অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশনের প্রবণতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

একদিকে রোগীদের সুস্থ করতে হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের লড়াই, অন্যদিকে হাসপাতালের বাইরে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন—এই দুইয়ের মধ্যে যেন কোনওভাবেই সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে না পড়ে, সেটাই এখন প্রশাসনের লক্ষ্য। ডায়মন্ড হারবার জেলা হাসপাতাল চত্বরে ফুড সেফটি বিভাগের এই অভিযান সেই বার্তাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিল—খাবারে ভেজাল বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশন, কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।