Sharif Osman Hadi grave next to Kaji Nazrul Islam নজরুলের দেহের পাশে সমাধিস্থ করা হল ভারতবিদ্বেষী বলে পরিচিত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে। এই সিদ্ধান্ত অনৈতিক, মনে করছেন নজরুলের পরিবার।

ছোটন সেনগুপ্ত, নিজস্ব সংবাদদাতা : কবি কাজী নজরুল ইসলাম, যাঁর কবিতা-গান সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। আজ থেকে ৫০ বছর আগে যাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে। অপরদিকে, বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক। যিনি নিজের বক্তব্যে ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতেন। যিনি বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা ছিলেন। যাকে গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার দুর্বৃত্তরা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়। এরপর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ওসমান হাদির। গত ১৮ই ডিসেম্বর মৃত্যু হয় তার। যা বাংলাদেশে ফের এক উত্তেজনা ও বিক্ষোভের জন্ম দেয়। এসবের মাঝেই শনিবার কবি নজরুলের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয় ওসমান হাদির দেহ। যা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। প্রশ্ন উঠছে, নজরুলের সমাধি থাকবে তো? পাশেই হাদিকে সমাধিস্থ করার পর আশঙ্কিত চুরুলিয়া ও কাজী পরিবার! তারা নিশানা করেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে। শনিবার পশ্চিম বর্ধমানের চুরুলিয়ায় কবির জন্মভূমিতে বসে তাঁর পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা, এর পর বাংলাদেশের জাতীয় কবির সমাধির উপর আক্রমণ হবে না তো! নজরুলের পরিবারের সদস্য সোনালি কাজীর বক্তব্য, নজরুলের দেহের পাশে সমাধিস্থ করা হল ভারতবিদ্বেষী বলে পরিচিত ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা অনৈতিক। নিয়ম মতো ওই স্থানে বিশেষ কয়েকজনকে সমাধিস্থ করা হয়। এত জায়গা থাকলেও কেন নজরুলের সমাধির পাশে হাদিকে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল? এর নেপথ্যে রাজনীতি রয়েছে বলে মনে করেন তারা।

সোনালি কাজি বলেন, আমাদের প্রাণের কবি শেষ জীবন কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। এত দিন বাংলাদেশে আমরা ভাল ছিলাম। কিন্তু এখন যা হচ্ছে! আমরা আশংকিত। তাঁর সংযোজন, ওই কবরস্থানে সকলকে সমাধিস্থ করা হয় না। কিন্তু ছায়ানট ভাঙচুর করা, রবীন্দনাথের বই পুড়িয়ে দেওয়া বাংলাদেশিদের উগ্রবাদীরা হাদিকে সমাধিস্থ করলেন কবির সমাধির পাশে! এটা হল কেন? নজরুল যেখানে সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে গিয়েছেন, জাতের নামে বজ্জাতির কথা বলেছেন, তখন তাঁর সমাধির পাশে এমন এক জনকে সমাধিস্থ করা হল সরকারের নির্দেশে! সোনালির আশঙ্কা, আগামিদিনে হয়তো কবির সমাধিও ওখানে থাকবে না। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলকে কি পরবর্তী প্রজন্ম অস্বীকার করবে? তাদের আর্জি, নজরুলকে যেন অসম্মান করা না-হয়। এই ঘটনায় নজরুল পরিবার থেকে শুরু করে গোটা চুরুলিয়াবাসী মর্মাহত।

১৯৭৬ সালে বিদ্রোহী কবি নজরুলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। সেখানে আততায়ীদের গুলিতে নিহত কট্টরপন্থী নেতাকে কোন যুক্তিকে কবর দেওয়া হয়, তাঁর মাথায় ঢুকছে না। হাদির মৃত্যুর খবরে বৃহস্পতিবার ঢাকায় যখন প্রতিবাদ মিছিল বেরোয়, তখন বিচারের দাবিতে রাস্তায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। ঢাকার বাইরে, দেশের অন্যত্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জুলাই ঐক্য ব্যানার নিয়ে ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রের বাইরেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। ভাঙচুর চলে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগের সম্পত্তির উপর। পরবর্তীতে সেই বিক্ষোভে যোগ দেয় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি NCP-র সদস্যরাও, যা স্টুডেন্টস এগেনস্ট ডিসক্রিমিনেশন অর্থাৎ SAD-এর শাখা সংগঠন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সুশীল সমাজের বড় অংশের মত, সেই কারণেই হাদির হত্যাকাণ্ডকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাশার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া এবং পদক্ষেপ করছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ আসার পর অল্প সময়ের মধ্যেই শোক জ্ঞাপন করেন প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস। মাঝরাতে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে হাদিকে প্রধান উপদেষ্টা ‘শহিদ’ আখ্যা দেন এবং শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের পর কবি নজরুলের সমাধির পাশেই সমাধিস্থ করা হয় ওসমান হাদির দেহ। যদিও, বিগত কয়েক মাসের রাজনৈতিক তৎপরতা ছাড়া রাজনীতি এবং সংস্কৃতি ও সমাজ জীবনে হাদির কোনও বিশেষ অবদানের কথা কারও জানা নেই। অনেকেরই বক্তব্য, জাতীয় কবি নজরুলসহ বিশিষ্টজনদের সমাধিস্থলের পাশে সমাহিত করার মত কোন ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় যোগ্যতার পরিচয় ছিল না। এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তাঁকে সমাহিত করার সিদ্ধান্তের পিছনে সরকার এবং জামাতি ইসলামের রাজনৈতিক অঙ্কই দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।