চাড্ডা- চাড্ডির প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন সায়নী!

সংসদে তাঁকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের তীব্র বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। কয়েকমাস পরই ভোলবদল।

নাজিয়া রহমান, সাংবাদিক : ‘আমি চাড্ডা নই, যে চাড্ডি হয়ে যাব।’ একদা বিজেপিতে রাঘব চাড্ডার যোগদানের পর কটাক্ষ করা তৃণমূলের বিশ্বস্ত সেই সৈনিক আজ বেসুরো। সাংবাদিকদের চাড্ডা- চাড্ডির প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন তিনি। বর্তমানে যিনি নাম লিখিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরে। বিদ্রোহী সাংসদের সই করা তালিকায় নাম রয়েছে এই বেসুরো সাংসদের। প্রকাশ্যে সেই তালিকা আসতেই পদ হারিয়েছেন এই সাংসদ। পোশাক- পরিচ্ছদ থেকে রাজনৈতিক বক্তৃতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কপি করা সাংসদ এখন বদলেছেন নিজের লুক। আর এই সাসদ আর কেউ নন তিনি হলেন একদা মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সায়নী ঘোষ।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তৃণমূল কংগ্রেসে দলের অন্তরে ভাঙ্গন ধরেছে। তৃণমূলের সাংসদ ও বিধায়কেরা বিদ্রোহের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির ঠিক এক মাসের মাথায় ৫৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক নিয়ে নতুন তৃণমূলের বিরোধী নেতা হয়েছেন তৃণমূল থেকে বহিস্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে ২০ জন সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন। যদিও কাকলির দাবি বিদ্রোহী সাংসদের সংখ্যাটা বেড়ে ২২ হয়েছে। তবে সবচেয়ে চর্চিত সাংসদ সায়নী ঘোষ। বামমনস্ক সায়নী তৃণমূলের হাত ধরে পুরোপুরি ভাবে রাজনীতিতে নামেন। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে আসানসোল দক্ষিণ থেকে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের কাছে পরাজিত হলেও ২০২৪ সালে যাদবপুর থেকে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের হয়ে প্রার্থী হন ও জয়ী হন। ধীরে ধীরে দিদির রেপ্লিকা হয়ে উঠেছিলেন সায়নী ঘোষ। মমতার মতোই সাদা শাড়ি, সাধারণ খোপা, আর দিদির স্টাইলের হাওয়াই চপ্পল পরতে দেখা যেত তাকে। শুধু পোশাক নয় রাজনৈতিক লড়াই এ স্ট্রেটকাট ছিলেন সায়নী। সংসদে তাঁকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের তীব্র বিরোধিতা করতে দেখা গেছে। কয়েকমাস আগেই আম আদমি পার্টি ছেড়ে বিজেপিতে যোগদান করেন রাঘব চাড্ডা। একদা জনকল্যাণমুখী বিষয় নিয়ে সাংসদে লড়াই করতে দেখা গিয়েছিল রাঘব চাড্ডাকে। মোবাইল এর রিচার্জ থেকে বিমানবন্দরে চা ও সিঙাড়ার দাম। সব কিছুতেই আওয়াজ ওঠাতে দেখা গিয়েছিল রাঘবকে। সেই রাঘব চাড্ডা বিজেপি-তে যোগদান করার পর বিরোধী দলের কাছে কটাক্ষের শিকার হন। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই নিয়েই কটাক্ষ করে রাঘবকে ‘চাড্ডি’ বলেছিলেন সায়নী। সায়নী ঘোষ বলেন, ‘আমার নাম সায়নী ঘোষ, আমি চাড্ডা নই যে চাড্ডি হয়ে যাব।’ কিন্তু ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর এই সায়নীই দলের বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখান। মমতা ও অভিষেকের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি এখন বেসুরো। রবিবার সকালে বাকিদের পাশাপাশি সায়নী ঘোষও দিল্লিতে পৌঁছন। বিমানবন্দরে পৌঁছতেই তাঁকে ‘চাড্ডা-চাড্ডি’ মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। যদিও এরআগে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে বেরোনোর সময় মাস্ক দিয়ে মুখ ঢাকা এবং টুপি পরে বেরোতে দেখা গিয়েছিল সায়নী ঘোষকে। কিন্তু দিল্লিতে বিদ্রোহী সাংসদের বৈঠকে যোগদানের সময় তিনি মাস্ক বা টুপি কিছুই পরে ছিলেন না।


যদিও সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে তিনি বলেন, ‘সব জেনে যাবেন। যখন বলার সময় আসবে, সব বলে দেব। আপনাদের জবাব দেব না, শুধু নিজের ক্ষেত্রের লোকেদের কাছেই বলব। আমার আওয়াজ সবার কাছেই পৌঁছবে, সঠিক সময়ে।’ অর্থাৎ তাঁর বক্তব্য, তিনি শুধুমাত্র নিজের এলাকার ভোটারদেরই জবাবদিহি করবেন, আর কাউকে নয়। এই বলে গাড়ীতে উঠে গাড়ীর দরজা বন্ধ করে দেন সায়নী। একটা সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কপি করা সায়নী ঘোষ বর্তমানে বদলে ফেলেছেন নিজের চালচলন, পোশাক আশাক তা বলা যেতেই পারে। সায়নী ঘোষের সেই চেনা ছবিটাই যেন বদলে গিয়েছে। শাড়ির বদলে জায়গা করে নিয়েছে জিন্স আর টি-শার্ট, সঙ্গে স্নিকার্স আর আধুনিক স্টাইলের পোশাক। তাঁর এই পরিবর্তন ঘিরেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জল্পনা। তাহলে কি মমতাকে দেখানোর জন্যই সায়নীর ওই সাজ ছিল? জিন্স-কুর্তি, ছোট করে কাটা চুলে দিল্লির বিমানবন্দরে দেখা মেলে সায়নীর।রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, সায়নীর এই নয়া ‘লুক’ শুধুই ব্যক্তিগত পছন্দের পরিবর্তন নয়, বরং তা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত হতে পারে । যদিও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ তিনি ।

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তাসেরঘরে পরিনত হয়েছে তৃণমূল। দিনে দিনে বাড়ছে বিদ্রোহীর সংখ্যা। লোকসভায় কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের নেতৃত্বে একাধিক সাংসদ মূল দলের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। সেই তালিকায় নাম রয়েছে সায়নী ঘোষেরও। বিদ্রোহী সাংসদের সই করা তালিকায় নাম রয়েছে সায়নীরও। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য তৃণমূল যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী পদ থেকে সরানো হয় যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষকে। সেই পদে আনা হয় অর্ণব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিধায়ক ও সাংসদের বিদ্রোহে দুরমুশের মত ভেঙ্গে পড়েছে তৃণমূল। প্রথমে তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে দলের ১৯ জন সাংসদ ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে নাম লেখান। এরপরই এই ১৯ জনের স্বাক্ষর সংবলিত একটি চিঠি প্রকাশ্যে আসে। সেই নিয়ে আলোচনার মাঝেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ আর এক সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্য়ায় ‘বিদ্রোহী’ শিবিরে নাম লেখান। মনে করা হচ্ছে, কাকলির পরিবর্তে সুদীপই এই ‘বিদ্রোহী’ শিবিরকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। অর্থাৎ সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০। যদিও কাকলি রবিবার দাবি করেছেন, ২০ নয়, বিদ্রোহী সাংসদদের সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে ২২ হয়েছে।