৫ অগাস্ট ঠিক কী হয়েছিল? একটি সাক্ষাৎকারে সেই বিষয়ে মুখ খুললেন শেখ হাসিনা।

জুলেখা নাসরিন, সাংবাদিক: ২০২৪-এর ৫ অগাস্ট বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন শেখ হাসিনা। ওইদিন বাংলাদেশে যে ঘটনা ঘটেছিল, সেই সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-ওজ-জামান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়ে সব সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা হাসিনা যেটা বলেছিলেন সেটাই করেছিলেন জেনারেল ওয়াকার। কিন্তু সেকথা আর বিশ্বাস করেন না বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা সন্দেহ করেন অগাস্টের আন্দোলনে ওয়াকারের ভূমিকা নিয়ে। খুব সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে ৫ অগাস্ট ঠিক কী হয়েছিল? সেই বিষয়ে মুখ খোলেন শেখ হাসিনা। একাধিক প্রশ্ন করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে।
প্রশ্নগুলি ছিল- এক – কোনো সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বা হুমকির ইঙ্গিত আপনাকে কি ঢাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করেছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল – অগাস্টে কি সত্যিকারের অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা, কমান্ডো কাঠামোর পতন, নাকি আপনার নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী থেকে নীরব সম্মতিতে জোরপূর্বক প্রস্থান ? তৃতীয় প্রশ্ন ছিল- দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে ওয়াকারের কী ভূমিকা ছিল? চতুর্থ প্রশ্ন- কোনো ষড়যন্ত্রের আভাস তিনি পেয়েছিলেন কিনা। পঞ্চম প্রশ্ন- বাংলাদেশে অভ্যুত্থানে আমেরিকার কী ভূমিকা ছিল। ষষ্ঠ প্রশ্ন- চিনের কী ভূমিকা ছিল। সপ্তম প্রশ্ন- ভারত কী ভাবে হসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি দেকছে। প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর মেলের মাধ্যমে দেন শেখ হাসিনা।
দ্বিতীয় প্রশ্ন অর্থাৎ অগাস্টে কি সত্যিকারের অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা, কমান্ডো কাঠামোর পতন, নাকি আপনার নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী থেকে নীরব সম্মতিতে জোরপূর্বক প্রস্থান ? এই প্রশ্নের উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, অগাস্টের শুরুতে, এক সময়ের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ, আচমকাই উগ্রপন্থী আন্দোলনকারীদের একটি সহিংস জনতার নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলার অবনতি করতে বাধ্য করা হয়। এটা সিভিল সার্ভিস চাকরির কোটা নিয়ে প্রাথমিক ছাত্র বিক্ষোভের থেকে অনেক দূরে ছিল। ফলে এটা অবশ্যই একটা গভীর এক ষড়যন্ত্র ছিল।
কিন্তু সবথেকে ইন্টারেস্টিং হচ্ছে ওয়াকারের বিষয়টা অর্থাৎ তৃতীয় প্রশ্ন। শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে ওয়াকারের কী ভূমিকা ছিল? “ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভলিউশন” এই বইয়ে কিছুটা আভাস পাওয়া যায় জুলাই-অগাস্ট আন্দোলনে ওয়াকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে। এবং তিনি যে পিছন থেকে হাসিনার পিঠে ছুরি বসিয়েছেন সেটাও কিছুটা স্পষ্ট হয়। কিন্তু এই আন্দোলেন ওয়াকারের ভূমিকা কতটা ছিল বা কি ভূমিকায় তিনি কাজ করেছিলেন সেটা কোনওভাবে জানা সম্ভব ছিল না শেখ হাসিনা মুখ না খোলা পর্যন্ত। কারন একাধিক সংবাদমাধ্যম নানা রকম তথ্য সামনে নিয়ে এসেছিল। এবার অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন শেখ হাসিনা।
তিনি ওই সাক্ষাতকারে তাঁর উত্তরে শেখ হাসিনা বলেছেন, ৩ অগাস্ট ২০২৪ জেনারেল ওয়াকার শেখ হাসিনাকে জানিয়ে দেন, হাসিনা সরকারের নির্দেশ তিনি আর মেনে চলবেন না। অর্থাৎ সরকারের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে সেনা এবার নিজেদের মতো কাজ করবে বাংলাদেশে। ৩ অগাস্টই বাংলাদেশে একটা খবর বিশালভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেনার অনান্য উচ্চপর্যায়ের আধিকারিকদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। অথচ সেই বৈঠকের কথা আদেও জানতেন না শেখ হাসিনা। অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ক্রমাগত আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন ওয়াকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু এদিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বাংলাদেশের উত্তাপ। ২০২৪ সালের ৪ অগাস্ট গভীর রাত পর্যন্ত সরকারের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে গণভবনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। সেই বৈঠকেও উপস্থিত ছিলেন জেনারেল ওয়াকার। বৈঠকের বিষয়বস্তু ছিল, ৫ অগাস্টের মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি কিভাবে ঠেকানো হবে সেটা নিয়ে আলোচনা। সেই আলোচনায় যোগ দেওয়ার আগে ওয়াকার কিন্ত একাধিক জায়গায় একাধিক মিটিং করেছিলেন। যে সমস্ত মিটিং সম্পর্কে ঘূণাক্ষরে জানতেনও না শেখ হাসিনা।
৫ অগাস্ট কি হল বাংলাদেশে। ৪ অগাস্টের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত মতো কাজ করল না সেনা। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৫ অগাস্ট ঢাকাকে সুরক্ষার বলয়ে মুড়ে রাখবে সেনা। একটা মাছি পর্যন্ত ঢাকায় ঢুকতে পারবে না, এমন সেনা নিরাপত্তা থাকবে রাজধানীতে জেনারেল ওয়াকারের নেতৃত্ব। কিন্তু ৫ অগাস্ট কি দেখা গেল,পুরো উল্টো ছবি ঢাকা জুড়ে। কোথায় সেনা, কোথায় নিরাপত্তা। ঢাকা শহরে ঢোকার যে সমস্ত পয়েন্ট বা রাস্তা রয়েছে, সেই সমস্ত জায়গায় সেনা মোতায়েন থাকবে এটা ছিল বৈঠকের সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ওই সমস্ত জায়গার সমস্ত সেনা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই জনতার ঢল বিনা বাধায় ঢুকে পড়ে রাজধানী ঢাকায়। এক কথায় বলতে গেলে ওয়াকারই আমন্ত্রন জানান বিদ্রোহকে।

শেখ হাসিনা আরও জানিয়েছেন, ৪ অগাস্ট গণভবন থেকে গভীর রাতে নিজের বাসভবন অর্থাৎ সেনাভবনে ফিরে ওয়াকার বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এমন কি খালেদা জিয়ার বর্তমান নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন জেনারেল ওয়াকার। তিনি বাংলাদেশের সমস্ত রাজনৈতিক নেতাদের বলেছিলেন ৫ অগাস্ট গণভবনে আসতে। তাহলে ওয়াকার কি একেবারে নিশ্চিত ছিলেন শেখ হাসিনার পতন শুধু সময়ের সময়ের অপেক্ষা। না কি ওয়াকাররা ষড়যন্ত্র করেছিলেন শেখ হাসিনাকে গণভবনে শেষ করে দেওয়ার। শেখ হাসনা জানিয়েছেন, ভারত শেখ হাসিনাকে সাহায্য করবে। আর সেনা বিমানেই তিনি বাংলাদেশ ছাড়বেন। শেখ হাসিনা বলছেন, ৫ অগাস্টের উত্তাল বাংলাদেশে পরিস্থিতি না সামলে, ওয়াকার তখন ব্যস্ত ছিলেন, সেনাভবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বৈঠকে। হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশে কে কুর্সিতে বসবেন। সেই আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। ওয়াকারের ভূমিকা এতদিন পর্যন্ত অস্পষ্ট ছিল প্রত্যকের কাছে।
শেখ হাসিনা ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন,তিনি যে ষড়যন্ত্রের শিকার সেটা আরও বুঝতে পারেন, যখন ইউনূস অভ্যুত্থান পরবর্তী সহিংসতায় জড়িত সমস্ত অপরাধীদের দায়মুক্তি দেন। এমনকি আমরা যে তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলাম অর্থাৎ শেখ হাসিনার সময়ে যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল ইউনুসের সরকার তা ভেঙে দেন। এর থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, যে হাসিনা সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনার প্লট সাজানো ছিল আগে থেকেই।