বাজেয়াপ্ত শেখ হাসিনার ৪ কোটির সম্পত্তি !

ট্রাইবুনালের নির্দেশ- হাসিনা ও কামালের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। শেখ হাসিনার সম্পদ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা।

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দেশের প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল- দু’জনেরই ফাঁসির সাজা ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-যুব বিক্ষোভ দমনের ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। রায় ঘোষণার পর আদালতকক্ষ হাততালিতে ফেটে পড়ে। ঠিক কী কী অভিযোগ ছিল? কতটা সম্পদ বাজেয়াপ্ত হচ্ছে? এখন সামনে কী পথ?

২০২৪ সালের জুলাই। বাংলাদেশজুড়ে ছাত্র-যুবদের ব্যাপক গণআন্দোলন। কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে রাস্তায় নামেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে,অভিযোগ ওঠে- সরকার পুলিশকে গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছে বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়- এই সময়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষ নিহত হন। মৃত্যু হয় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদসহ চানখাঁরপুল ও আশুলিয়ার বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারীর। অনেককে অত্যাচার, গুলি এবং অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাকেই পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল নাম দেয়- জুলাই গণহত্যা।

ট্রাইবুনালে হাসিনা, কামাল এবং সাবেক পুলিশের শীর্ষকর্তাদের বিরুদ্ধে মোট ৫টি অভিযোগ আনা হয়। আদালতের মতে তিনটি গুরুতর ধারায় অপরাধ প্রমাণিত:

উস্কানিমূলক ভাষণ
হাসিনা বিভিন্ন ভাষণে ছাত্র-যুবদের ‘রাজাকার’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দেন। আদালতের ভাষ্যে- এই মন্তব্যগুলি পরিস্থিতিকে “অগ্নিগর্ভ করে তোলে”।

মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ
আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ড্রোন, হেলিকপ্টার, লাইভ অ্যামুনিশন ব্যবহার করার সরাসরি অনুমতি দেন হাসিনা। এমনকি গুলির নির্দেশ দেওয়ার অডিও এবং ভিডিও আদালতে যাচাই করা হয়েছে- যেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হয়েছে।

পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা
যেখানে পুলিশ বিক্ষোভ শান্ত রাখার দায়িত্ব ছিল, সেখানে অভিযোগ- হাসিনা নিজে পুলিশকে ‘অলস ও নিষ্ক্রিয়’ করে রেখেছিলেন। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদকে খুব কাছ থেকে বারবার গুলি করার ঘটনাও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

সোমবার প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে ৪৫৩ পাতার রায় পড়ে শোনান তিনজন বিচাপতি- বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার, বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালতের কঠোর পর্যবেক্ষণ:


ক্ষমতায় থাকার লোভে হাসিনা ছাত্র আন্দোলনকে অবহেলা করেছেন
সংগঠিত হামলা হয়েছে সরকারের নির্দেশে- এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
অপরাধের পরে কোনও অনুশোচনা নেই, বরং বারবার হুমকি দিয়েছেন আধিকারিক ও ট্রাইবুনালের কর্মীদের
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বদলাতে চিকিৎসকদের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছিল

রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আদালতকক্ষে উপস্থিত নিহতদের পরিবার উল্লাসে গর্জে ওঠে। হাসিনা তিন ধারায় দোষী-


উস্কানিমূলক মন্তব্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
বাকি দু’টি ধারায় মৃত্যুদণ্ড

একইসঙ্গে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও মৃত্যুদণ্ড পান। অভিযুক্ত পুলিশকর্তা চৌধুরী আবদুল্লা আল-মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। ট্রাইবুনালের নির্দেশ- হাসিনা ও কামালের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। শেখ হাসিনার সম্পদ বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪ কোটি ৩৪ লক্ষ টাকা।

নগদ অর্থ: ২৮,৫০০ টাকা
ব্যাঙ্ক জমা: ২ কোটি ৩৯ লক্ষ টাকা
সঞ্চয়: ২৫ লক্ষ টাকা
স্থায়ী আমানত: ৫৫ লক্ষ টাকা
৩টি গাড়ি—একটি উপহার, দুটি মিলিয়ে দাম প্রায় ৪৭ লক্ষ টাকা
গয়না: ১৩ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা
আসবাবপত্র: সাড়ে ৭ লক্ষ টাকা
কৃষিজমি: ১৫.৩ বিঘা (টুঙ্গিপাড়া, গোপালগঞ্জ, গাজিপুর, রংপুর)
৩ তলা বাড়ি (টুঙ্গিপাড়া)
গাজীপুরের মৌচাকে ৯ বিঘা জমির ওপর বাগানবাড়ি
ঢাকার পূর্বাচলে ৩৫ লাখি একখণ্ড জমি
এছাড়া অভিযোগ- হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন নিজের পরিবার ৬ জনের জন্য ৬০ কাঠা প্লট ‘অনৈতিকভাবে’ বরাদ্দ করিয়েছিলেন। আসাদুজ্জামান খান কামালের সম্পদও একইভাবে বাজেয়াপ্ত হবে- যদিও তার বিস্তারিত হিসেব এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। হাসিনা এবং কামাল- দু’জনই বর্তমানে ভারতে। সরকার পক্ষ জানিয়েছে- তারা আপিল করতে পারবেন না, কারণ তাঁরা পলাতক। আপিল করতে হলে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানাবে। ট্রাইবুনাল বলেছে, জুলাই হত্যাকাণ্ডে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে সরকারকে। এটি রায়ের বাধ্যতামূলক অংশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম কঠোর রায়। একদিকে আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালের সাজা, অন্যদিকে হাসিনার পলাতক অবস্থা- এখন পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নজর বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কের দিকে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কী সিদ্ধান্ত নেন হাসিনা, ভারত সরকার কী করে- তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা।