লিওনেল মেসির স্বপ্নের শেষ অধ্যায় শেষ হল গভীর হতাশায়।

আরপ্লাস নিউড ডিজিটাল ডেস্ক : কথায় আছে “HISTORY REPEATS ITSELF”। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে এই কথাই যেন সত্যি হল। শুধু বদলে যায় সময়, মাঠ আর নায়কের নাম। সেই ২০১০ সালে অতিরিক্ত সময়ের এক গোলে স্পেন বিশ্বকাপ জিতেছিল। ২০১৪ সালে অতিরিক্ত সময়ের এক গোলে বিশ্বকাপ হারার যন্ত্রণা বুকে নিয়ে মাঠে ছেড়েছিল আর্জেন্তিনা। আর ২০২৬। যেন সেই দুই ইতিহাস এক সুতোয় গেঁথে আবারও ফিরে এল। অতিরিক্ত সময়, বদলি ফুটবলারের গোল, মেসির হতাশা আর স্পেনের বিশ্বজয়ের উল্লাস। সব মিলিয়ে নিউ জার্সির রাত যেন ফুটবল ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় গড়ল। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট উঠল স্পেনের মাথায়। আর লিওনেল মেসির স্বপ্নের শেষ অধ্যায় শেষ হল গভীর হতাশায়।
নিউ জার্সির স্টেডিয়ামে প্রায় ৮৩ হাজার দর্শকের সামনে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল স্পেনের হাতে। গ্যালারির বড় অংশ আর্জেন্তিনার সমর্থকে ভরা থাকলেও মাঠের লড়াইয়ে আধিপত্য বিস্তার করে লা রোহা। একের পর এক আক্রমণ, নিখুঁত পাসিং, দুরন্ত গতি এবং বলের দখল। সব বিভাগেই স্পেন ছিল অনেক এগিয়ে। বিপরীতে আর্জেন্তিনা শুরু থেকেই রক্ষণাত্মক ফুটবলে ভরসা করে। যেন গোল না খাওয়াটাই ছিল তাদের প্রথম লক্ষ্য। আক্রমণে ওঠার সাহস বা পরিকল্পনা কোনোটাই চোখে পড়েনি। প্রথমার্ধ থেকেই স্পেন বলের দখল রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ সাজাতে থাকে। মাঝমাঠে রদ্রির নেতৃত্বে দুই প্রান্তে লামিন ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা ও মার্ক কুকুরেয়ার দৌড়ঝাঁফ বারবার সমস্যায় ফেলে আর্জেন্তিনার রক্ষণকে। লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো অসাধারণ লড়াই করলেও চাপ সামলাতে গিয়ে প্রায় পুরো ম্যাচটাই নিজেদের বক্সের আশেপাশে কাটাতে হয় তাদের। অন্যদিকে আর্জেন্তিনার আক্রমণভাগ ছিল কার্যত নিষ্প্রভ। প্রথম ২০ মিনিটে মেসি মাত্র দুবার বল স্পর্শ করেন। গোটা প্রথমার্ধে তাঁর পায়ে বল পৌঁছায় হাতে গোনা কয়েকবার। এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দি পল কিংবা পারেদেস কেউই মেসির কাছে বল পৌঁছে দেওয়ার কাজটা করতে পারেননি।

বিশ্বকাপের আগের নকআউট ম্যাচগুলোতে পিছিয়ে পড়েও দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের নজির গড়েছিল আর্জেন্তিনা। কিন্তু ফাইনালে সেই লড়াইয়ের মানসিকতা দেখা যায়নি। বরং পুরো দলটিই যেন নিজেদের অর্ধেই বন্দি হয়ে পড়েছিল। স্কালোনির কৌশলও ব্যর্থ হয়। প্রথম একাদশে তিনটি পরিবর্তন এনে তিনি আক্রমণে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করলেও স্পেনের সংগঠিত ফুটবলের সামনে তা কার্যত ভেস্তে যায়। মন্তিয়েলকে প্রান্ত ব্যবহার করার সুযোগ দেয়নি স্পেন। দি পল মাঝমাঠে নিজের ছন্দ খুঁজে পাননিষ আর পারেদেসও ম্যাচের প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হন। ম্যাচ যত গড়াতে থাকে স্পেনের চাপ ততই বাড়তে থাকে। আর্জেন্তিনার রক্ষণ এবং গোলরক্ষক মান্তিনেজের দৃঢ়তায় নির্ধারিত ৯০ মিনিটে গোলের দেখা পায়নি স্পেন। তখন অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছিল এত আধিপত্যের পরও যদি স্পেন জিততে না পারে তবে কি আবারও ফুটবল দেখবে এক নতুন ইতিহাস। ফুটবল শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্তই খেলা। অতিরিক্ত সময়ের ম্যাচের ১১৬ মিনিটে আসে সেই সুযোগ। পেদ্রো পোরোর নিখুঁত ক্রস থেকে নিকো উইলিয়ামসের হেড। আর সেই বলেই সুযোগ পান বদলি হিসেবে নামা ফেরান তোরেস। মুহূর্তের মধ্যে বাঁ পায়ের জোরালো শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে যায়। আনন্দে ফেটে পড়ে স্পেনের ফুটবলাররা। সেই এক গোলই স্পেনকে এনে দেয় দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
আর্জেন্তিনার জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ডের পর। প্রথমে হলুদ কার্ড এবং পরে কুবারসির উপর ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। দশ জনের দল নিয়ে শেষ মুহূর্তে ফিরে আসার চেষ্টা করলেও সেই সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। শেষ কয়েক মিনিটে কয়েকটি আক্রমণ গড়ে তুললেও তা স্পেনের রক্ষণ ভাঙার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ম্যাচের পরিসংখ্যানই বলে দেয় দুই দলের পার্থক্য কতটা ছিল। স্পেন ম্যাচে ২০টি শট নেয়। যেখানে আর্জেন্তিনা পুরো ম্যাচে মাত্র তিনটি শট নিতে সক্ষম হয় ও সেগুলিও আসে ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে। বলের দখল ছিল স্পেনের ৬৮ শতাংশ। আর্জেন্তিনার মাত্র ৩২ শতাংশ। পাস, নিখুঁত পাস, কর্নার প্রতিটি বিভাগেই স্পেন ছিল স্পষ্টভাবে এগিয়ে। তাই এই বিশ্বকাপ জয় যে সম্পূর্ণ প্রাপ্য তা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় হতাশার নাম অবশ্য লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপজুড়ে তাঁর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব বহুবার আর্জেন্তিনাকে পথ দেখিয়েছে। ফাইনালে তাঁকে যেন খুঁজেই পাওয়া যায়নি। ৩৯ বছর বয়সে হয়তো আগের মতো গতি নেই কিন্তু তাঁর পায়ে বল পৌঁছে দেওয়ার ন্যূনতম কাজটুকুও সতীর্থরা করতে পারেননি। ফলে নিজের জাদু দেখানোর সুযোগই পাননি ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা। পুরো ম্য়াচে তাঁর প্রভাব ছিল প্রায় অদৃশ্য। নিউ জার্সির মাঠটিও মেসির কাছে সুখস্মৃতি হয়ে থাকল না। এক দশক আগে এই মাঠেই কোপা আমেরিকার ফাইানলে শিরোপা হারিয়েছিল আর্জেন্তিনা। সেই একই ভেন্যুতে আবারও বিশ্বকাপ হাতছাড়া করতে হল। ট্রফি জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামা মেসিকে শেষ পর্যন্ত চোখে জল নিয়েই বিদায় নিতে হল।
একটা কথা তো বলতেই হবে স্পেন প্রমাণ করল নিজেদের। অন্যদিকে মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হল অপূর্ণতার আক্ষেপ নিয়ে। ফুটবল শুধু জয় পরাজয়ের গল্প নয়। নতুন ইতিহাস জন্ম নেওয়ার সুন্দর মঞ্চ। শুরুতেই যে কথাটাটি বলেছিলাম “HISTORY REPEATS ITSELF”। আর ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনাল সেই কথারই জীবন্ত প্রমাণ হয়ে উঠল। এই স্পেন দলকে কোথায় রাখবেন সর্বকালের সেরা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের তালিকায়?