জঙ্গি সুইসাইড বোম্বিং বা আত্মঘাতী বিস্ফোরণকে সমর্থন করে ভিডিও দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে মূল চক্রী তথা চিকিৎসক উমর-নবির।
অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : সবাই ভুল বোঝে। মানুষের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ভুল ধারণা। মৃত্যুর আগে বোঝানোর চেষ্টা। অন্যভাবে বলতে গেলে বলাই যায় মগজ ধোলাই। ব্যাখ্যামূলক এই ভিডিওটা করেছিল মৃত্যুর দুমাস আগে। তখন ভিডিওটা সামনে না এলেও মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে সেই ভিডিও। সাধারণ বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে আত্মঘাতী বোমার ফারাক কতটা? কেন আত্মঘাতী বোমারু বানানো হয় ? আত্মঘাতী বোমারুদের নিয়ে নাকি সমাজের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এই ভিডিয়োতে গোটা গোটা ইংরেজিতে এই জঙ্গি সুইসাইড বোম্বিং বা আত্মঘাতী বিস্ফোরণকে সমর্থন করেছে।

১০ নভেম্বর। অন্যান্য দিনের মতো হাই অ্যালার্ট জোন রাজধানীর লালকেল্লার সামনে বিস্ফোরণ। ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর যার ছবি প্রথম প্রকাশ্যে আসে, সে উমর নবি। ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজে পার্কিং লটে দেখা যায় তাঁকে। বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় দেহ। পরে মায়ের সঙ্গে ডিএনএ ম্যাচ করতেই স্পষ্ট হয়ে যায় পরিচয়। ঘটনার এক সপ্তাহ বাদে প্রকাশ্যে এল একটি ভিডিয়ো। সম্ভবত এটাই উমরের শেষ ভিডিয়ো বলে মনে করা হচ্ছে। সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী এক ব্যক্তি। মুখে একগাল দাড়ি। পরণে কালো টি-শার্ট। তাতে একটি ল্যাপেল লাগানো। চোখে-মুখে অদ্ভুত একটা শান্তভাব। একটি ঘরে বসে রয়েছে ব্যক্তিটি। এতক্ষণে বুঝতেই পেরেছেন ইনি হলেন দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে মূল চক্রী তথা চিকিৎসক উমর-নবি। সামনে ক্যামেরা চালু করা। খুব ধীরস্থির ভাবে বলা শুরু। একেবারে পরিশিলিত বয়ানে এবং বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণে বলা শুরু করল সে। শোনাতে শুরু করল আত্মঘাতী বোমারু নিয়ে সমাজের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। সাধারণ বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে আত্মঘাতী বোমার কতটা ফারাক, কেন আত্মঘাতী বোমারু বানানো হয়, খুব সংক্ষেপে সেই ব্যাখ্যা দিল দিল্লি বিস্ফোরণকাণ্ডে আত্মঘাতী বোমারু। উমরকে বলতে শোনা যায় যাদের আত্মঘাতী বোমারু বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আসলে তাঁরা আত্মঘাতী বোমারু নন। তাঁরা আসলে ইসলামের এক একজন শহিদ। আত্মঘাতী বোমারুদের শহিদ বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছে নবির।

আত্মঘাতী বোমারু সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ‘মার্টারডম অপারেশন’-এর কথাও শোনা গেল। সে বলছে আত্মঘাতী হামলার সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, যখন কোনও ব্যক্তি এটা মেনে নেন যে, তাঁর মৃত্যু একটি নিশ্চিত সময়, নিশ্চিত স্থানে হবে, তখন তাঁকে একটি ভয়ানক মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তখন তিনি এটাই মেনে চলেন যে, মৃত্যুই তাঁর একমাত্র গন্তব্য। একটা বিশেষ লক্ষ্যে, বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হয়। আর তাঁকে শুধু আত্মঘাতী বোমারু বলেই দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। আর এখানেই আত্মঘাতী বোমারু বা হামলা নিয়ে ভুল ধারণা সমাজের।
পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অত্যন্ত মেধাবী ছিল উমর। নিজের পড়াশোনা ও কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকত। তবে বিগত দুই বছর ধরে তার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছিল। টেলিগ্রামের বিভিন্ন গ্রুপে যোগ দিয়েছিল উমর,। যেখানে মগজ ধোলাই করা হত। উমর উন নবি কেন চিকিৎসা পেশা ছাড়েন, কীভাবে তিনি এই পথে জড়িয়ে পড়েন, তা জানতে তাঁর পুরনো যোগাযোগ ও অনলাইন কার্যকলাপ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উগ্রপন্থী প্রচারমূলক কনটেন্ট দেখতেন এবং গোপনে তা প্রচারও করত। যে কোনও নাশকতার কার্যকলাপের পিছনে দীর্ঘদিন ধরে চলে মগজধোলাই। এই ভিডিয়ো দেখে বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে উমর মগজধোলাই করছে। বোঝানো হয় যে আত্মঘাতী হামলায় মৃত্যু হওয়াটা ভাল। এভাবেই শিক্ষিত যুবক-যুবতীদেরও নাশকতার কার্যকলাপে টেনে আনা হয়।
দিল্লি বিস্ফোরণের ঘটনার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গিয়েছে। তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে বিস্ফোরক সব তথ্য। বিস্ফোরণকাণ্ডের তদন্তে এই ভিডিও নতুন মোড় আনল। তদন্তকারীদের ধারণা, হামলা চালানোর কিছুদিন আগে এই ভিডিও তৈরি করে ওই চিকিৎসক। চিন্তার বিষয় হল, তথাকথিত জঙ্গি সংগঠনগুলির বাইরে উমর নবির মতো শিক্ষিত ব্যক্তিরা সন্ত্রাসের রাস্তায় হাঁটছেন। এমনকী মানুষ মারার মতো জঘন্য কাজের ন্যায্যতা প্রমাণেরও চেষ্টা করছেন।