রাজনীতিতে বড় চর্চায় এখন নেতা-মন্ত্রীদের পিএ। নেতা মন্ত্রীদের হাঁড়ির খবর তঁদের কাছেই থাকে আরকি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একসময়ের পিএ চন্দ্রনাথের মৃত্যুরহস্য যেমন বহুল চর্চিত তেমনি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিএ সুমিত রায়ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এতদিন তাঁকে নিয়ে খোঁজ খোঁজ রব উঠেছিল। কেউ কেউ তাঁর বেঁচে থাকা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সব আশা আশঙ্কা ও নিন্দুকদের বাড়া ভাতা ছাই দিয়ে হঠাৎ করে উদয় হলেন সুমিত রায়। এতদিন কোথায় ছিলেন গা ঢাকা দিয়ে। কার নিরাপদ আশ্রয়ে ছিলেন তিনি। তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। ভাবুন একবার ভিন দেশে নয় এ রাজ্যেই আত্মগোপন করেছিলেন সুমিত রায় আর পুলিশ তাঁর টিকিটি ছুঁতে পারে নি। নেতা, মন্ত্রী না হয়েও বেশ প্রভাবশালী, কি বলুন। তবে কি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুরক্ষা বলয়েই ছিলেন সুমিত।
রাজনীতিতে বড় চর্চায় এখন নেতা-মন্ত্রীদের পিএ। অর্থাৎ পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। নেতা মন্ত্রীদের হাঁড়ির খবর তঁদের কাছেই থাকে আরকি। যেমনটা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিএ সুমিত রায়। যার চর্চা বঙ্গ রাজনীতে করেননি এমন তৃণমূল নেতা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তৃণমূলের ছোট-বড় সবাই চেনেন এই সুমিত রায়কে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরে যদি কোনও নাম থেকে থাকে তিনি হলেন এই সুমিত রায়। দলের হারের পর যার বিরুদ্ধে একযোগে সরব হয়েছিলেন বিধায়ক সাংসদরা। শোনা যায় ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশ প্রশাসনও সমঝে চলতো এই সুমিতবাবুকে। বুঝতে পারছেন নেতা, মন্ত্রী না হয়েও কত বড় কেউকেটা। এই হেন সুমিত রায়কে এবার বাগে পেয়েছেন তদন্তকারী অফিসাররা। তার মাথার উপর ঝুলছে একাধিক মামলা। কী নেই সেই তালিকায় জমি দুর্নীতি থেকে, চাকরী দুর্নীতি সবেতেই নাম রয়েছে তার। সুমিতের বিরুদ্ধে জমি দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের হয়েছিল শালবনি থানায়। সেই মামলাতেই তাঁকে খুঁজতে অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছিল পুলিশ। মাঝরাতে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির তালা ভেঙে সুমিতের খোঁজে তল্লাশি চালানোও হয়েছিল। তৃণমূল সাংসদের আপ্তসহায়কের খোঁজ মেলেনি। আগাম রক্ষাকবচ চেয়ে সুমিত আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। চাকরী দুর্নীতির একটি মামলায় কলকাতা হাই কোর্ট তাঁকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছে। তদন্তে সহযোগিতার শর্তে ওই মামলায় রক্ষাকবচ পান সুমিত। শীর্ষ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী শুনানির দিন পর্যন্ত সুমিত রায়কে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে তিনি তদন্তে সহযোগিতা করবেন। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সুমিতকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে তদন্তকারী সংস্থা। এর পরেই শুক্রবার তাঁর নিউ আলিপুরের বাড়িতে গিয়ে নোটিস দিয়ে আসে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। সেই অনুসারে শনিবার সকাল ১০ টায় ভবানীভবনে হাজিরার দেন সুমিত রায়। হাজিরা তো দিলেন সুমিত রায়। এবার কি তবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাপ আরও বাড়তে চলেছে? বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না কান টানলে মাথা আসে।
কিন্তু যাকে নিয়ে এত চর্চা সেই সুমিত রায়কে ভালো করে দেখুন। এতটুকুও ভয়-ভীতি নেই তার চোখে মুখে। হন্তদন্ত হয়ে ভবানীভবনে ঢুকে গেলেন পুলিশ অফিসাররা তাঁর পিছনে। আঙুল তুলে ইন্সট্রাকশনও দিতে দেখা গেল তাকে। একজন আপ্ত সহায়কের এত হম্বিতম্বি কীভাবে? পুলিশ থেকে ঠিকাদার সবাইকেই হুমকি, ধমকি দিয়ে রাখতো সুমিত রায়। এমনটাই অভিযোগ উঠেছে। টুলু মণ্ডলকে মনে আছে তো? অভিযোগ উঠেছিল এই টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে এক ঠিকাদার মুখ খোলায় তাঁকে ডেকে চমকে ছিলেন সুমিত। টুলুর বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে বলা হয় ওই ঠিকাদারকে। তার মানে টুলু মণ্ডলের বাড় বাড়ন্ত নিয়ে বেশ অবগত ছিলেন সুমিত রায়। তবে কি সত্যিই ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল পাথরখাদান সম্রাটের সঙ্গে?

কথায় আছে যাহা রটে তার কিছুটা তো বটে। এই সুমিত রায়ের নামে সোশ্যাল মাধ্যমে ফ্যান পেজ রয়েছে। কেউ কেউ বলতেন, বস। কারও কাছে ছিলেন দাদা। শোনা যায়, অভিষেকের সঙ্গে একই স্কুলে ও ক্লাসে পড়তেন সুমিত। যদিও অভিষেককে বরাবর স্যর বলেই ডাকতো সুমিত। অভিষেকের রাজনৈতিক কেরিয়ার যখন থেকে শুরু, তখন থেকেই সঙ্গী এই সুমিত রায়। দক্ষিণ কলকাতার নবনালন্দা স্কুলে পড়তেন অভিষেক। সুমিতও অভিষেকের সহপাঠী ছিলেন নবনালন্দায়। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে পড়াশোনা করতে চলে গেলেও সুমিতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল। দলের অন্দরে শোনা যেত, সুমিতের প্রভাব শুধু দলেই নয়, প্রশাসনেও ছিল বেশ মজবুত। তৃণমূলের নেতা, কর্মীদের কথায়, সুমিত কখনও নির্বাচনের রাজনীতি করেননি, কিন্তু অভিষেকের কাছে পৌঁছতে গেলে সুমিতই ছিল প্রধান মাধ্যম। সুমিতকে টপকে অভিষেক পর্যন্ত পৌঁছনো যেত না। ২০১১ সালের ২১ জুলাই রাজনীতিতে এন্ট্রি হয় অভিষেকের। অভিষেক হয়ে উঠলেন তৃণমূল কংগ্রেসের যুবনেতা। তখন অবশ্য সুমিত ঘনিষ্ঠবৃত্তে ছিলেন না। ওই সময়ে অভিষেকের সবচেয়ে কাছাকাছির বৃত্তে থাকতেন বিনয় মিশ্র, প্রতীক দেওয়ান, রোহিত আগরওয়াল, করণ শর্মারা। পরবর্তী সময়ে কয়লাপাচার মামলায় বিনয়ের নাম জড়িয়ে যায়। বিনয় সরে যান। বাকিরাও অভিষেক থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করে, তখনই সুমিতের এন্ট্রি। অভিষেকের সংসদীয় এলাকা ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন চালাত মূলত সুমিতই। স্থানীয় নেতাদের দাবি, রাজনৈতিক হোক বা প্রশাসনিক, সুমিতের মাধ্যমেই কাজ হত। সুমিত ছিলেন বেতাজ বাদশা। শালবনি ও মেদিনীপুর ব্লকের প্রায় ৩০০ একর সরকারি জমি জালিয়াতি করে বিক্রি করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় মেদিনীপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরাকে। অভিযোগ, এই সরকারি জমির চরিত্র বদলে প্লট করে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছিল। জমির চারপাশে তোলা হয় পাঁচিলও। পশ্চিম মেদিনীপুরে শালবনিতে এই জমি জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলায় গত ৬ জুন গ্রেফতার করা হয় সুজয় হাজরাকে। সুজয়কে জেরা করেই উঠে আসে অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্য়ায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের নাম। বিভিন্ন তথ্য় থেকে জানা যায়, সুজয় হাজরা ও সুমিত রায়ের মধ্য়ে কোটি টাকার ওপর আর্থিক লেনদেন হয়েছে। এর পরেই খোঁজ পড়ে সুমিত রায়ের। ৪ মে ভোটের রেজাল্ট প্রকাশের পর থেকে বেপাত্তা ছিলেন সুমিত রায়।এতদিন পর দেখা মিলল অভিষেকের আপ্ত সহায়কের। এখন দেখার সুমিত রায় নিয়ে জল কতদূর গড়ায়।