প্রথমে আঘাত করো, দ্রুত আঘাত করো এবং শত্রুর আক্রমণ করার ক্ষমতাকে আগেই দুর্বল করে দাও।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : পশ্চিম এশিয়ার আকাশে যখন যুদ্ধের উত্তেজনা ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে উঠছে তখন আমেরিকার সামরিক কৌশলও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ইরানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ অনেকের কাছেই শক্তি প্রদর্শনের এক স্পষ্ট উদাহরণ বলে মনে হতে পারে। ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা, নৌবাহিনীর সম্পদ ধ্বংস করা কিংবা সম্ভাব্য আক্রমণের উৎস আগেভাগে নিষ্ক্রিয় করার মতো পদক্ষেপগুলো যেন একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, প্রথমে আঘাত করো, দ্রুত আঘাত করো এবং শত্রুর আক্রমণ করার ক্ষমতাকে আগেই দুর্বল করে দাও। এই কৌশলকে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী বলেই মনে হয়। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এই আক্রমণাত্মক অবস্থানের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে এক ধরনের কৌশলগত উদ্বেগ।
সামরিক শক্তির ইতিহাসে প্রায়ই বলা হয় সেরা প্রতিরক্ষা হলো শক্তিশালী আক্রমণ। কিন্তু বাস্তবে যখন একটি শক্তিধর দেশ বারবার আগাম হামলার ওপর নির্ভর করে, তখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করে তার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর আস্থার মাত্রা নিয়ে। আমেরিকার বর্তমান কৌশল সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে আসে। ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে ধ্বংস করতে আগেভাগে আক্রমণ চালানোর এই তৎপরতা যেন ইঙ্গিত দেয় আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর পুরোপুরি ভরসা এখনো গড়ে ওঠেনি। যখন কোনো সেনাবাহিনী তার তলোয়ারের উপরই বেশি নির্ভর করতে শুরু করে তখন অনেক সময়ই বোঝা যায় যে ঢালের শক্তি নিয়ে তার নিজের মধ্যেই কিছু সংশয় রয়েছে। কাগজে কলমে দেখলে আমেরিকার এই আক্রমণাত্মক কৌশল নিঃসন্দেহে এক সুপারপাওয়ারের পরিচয় বহন করে। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনী শত্রুর লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে, সেগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং দ্রুত ধ্বংস করতে সক্ষম। ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র কিংবা কমান্ড কাঠামোকে আগে থেকেই ধ্বংস করে দেওয়ার এই ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন সামরিক শক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতা অনেক বদলে গেছে। ইরানের মতো প্রতিপক্ষকে যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ের সামরিক শক্তি তৈরি করতে হয় না। বরং তারা অপেক্ষাকৃত সস্তা কিন্তু সংখ্যায় বিপুল ড্রোন বা ক্রমশ উন্নতমানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে পারে। এই অসম যুদ্ধনীতিই আধুনিক সংঘাতের হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে।

এখানেই সামনে আসে প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নের প্রশ্ন। যদি আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সত্যিই এমন শক্তিশালী হতো যে তা নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলকভাবে কম খরচে সব ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে তাহলে হয়তো আগাম হামলার এত তাড়াহুড়ো প্রয়োজন হতো না। বাস্তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা কাঠামো এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা অর্থনৈতিক বৈষম্য মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অনেক সময় বহু মিলিয়ন ডলারের ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হয় এমন ড্রোন ধ্বংস করতে, যার দাম তার তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভর করে যুদ্ধ চালানো অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয়ে ওঠে না। এর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের গতিও প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। নতুন প্রজন্মের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ক্রয় প্রক্রিয়ার ধীরগতি অনেক সময় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। লেজার বা মাইক্রোওয়েভের মতো ডাইরেক্টেড-এনার্জি অস্ত্র, যেগুলো তুলনামূলক কম খরচে ড্রোনের ঝাঁক প্রতিহত করতে পারে, সেগুলোর দ্রুত মোতায়েন এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মার্কিন সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়ে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের মাধ্যমে উৎসস্থলেই হুমকি ধ্বংস করার কৌশল বেছে নেয়। যেন তীরগুলো আকাশে ছোড়ার আগেই ধনুকধারীকেই থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

এই ধরনের আক্রমণনির্ভর কৌশলের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এর দীর্ঘমেয়াদি মান। ধারাবাহিক সামরিক অভিযান চালাতে বিপুল পরিমাণ নির্ভুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে এই মজুদ দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি নির্ধারকদের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন অর্থ বরাদ্দ করে অস্ত্রভান্ডার পুনরায় পূরণ করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা চলছে। দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানো মানে শুধু অর্থনৈতিক চাপই নয়, বরং সামরিক প্রস্তুতির ওপরও প্রভাব ফেলা। কারণ একই সময়ে বিশ্বের অন্য কোনো বড় সংঘাতে জড়াতে হলে এই অস্ত্রভান্ডারই প্রয়োজন হবে।
সবশেষে বলা যায় যে, প্রকৃত কৌশলগত প্রতিরোধ শক্তি সবসময়ই দুটি বিষয়ের ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে একদিকে আঘাত হানার শক্তি, অন্যদিকে আঘাত সহ্য করার সক্ষমতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান কৌশল হয়তো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতির জন্য একটি বাস্তবসম্মত সমাধান। কিন্তু এটিকে দীর্ঘমেয়াদি শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন এক প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রতিফলন, যা এখনো পুরোপুরি আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। যতদিন না সস্তা ও ব্যাপক আক্রমণের বিরুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষা সত্যিকার অর্থে দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে, ততদিন আগাম আক্রমণের ওপর এই নির্ভরতা থেকেই যাবে এবং সেটি অনেকের চোখে কৌশলগত শক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হবে।