ভাতা সংস্কৃতির সমালোচনায় সুপ্রিমকোর্ট

বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা দেশে কী ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাইছেন?”

মাম্পি রায়, সাংবাদিক: মুখে ‘ভাতা’ সংস্কৃতি নিয়ে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের। বিভিন্ন রাজ্যে ভোটের ঠিক আগে নাগরিকদের হাতে নগদ অর্থ, ভাতা বা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়ার ঘোষণার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করল দেশের শীর্ষ আদালত। একটি মামলার শুনানিতে তামিলনাড়ু সরকারকে ভর্ৎসনা করে প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা দেশে কী ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চাইছেন?”

সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court of India) প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের (Justice Surya Kant) নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ( Justice Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলি (Justice Bipul Pancholi). বিদ্যুৎ সংশোধনী বিধি, ২০২৩-এর একটি ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে তামিলনাড়ু পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কর্পোরেশন লিমিটেডের (Tamil Nadu Power Distribution Corporation Limited) দায়ের করা রিট পিটিশনের শুনানি চলাকালীন শুরু থেকেই ‘খয়রাতি রাজনীতি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি। তাঁর পর্যবেক্ষণ, “নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে কল্যাণমূলক প্রকল্প ঘোষণা করা এখন এক ধরনের প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। নগদ অর্থ স্থানান্তর বা ভাতা ঘোষণার ক্ষেত্রে রাজ্যগুলি আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্নে যথেষ্ট সতর্ক হচ্ছে কি না?”- তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে বেঞ্চ।

প্রধান বিচারপতি বলেন, “যাদের সামর্থ্য আছে এবং যাদের নেই—এই দু’য়ের মধ্যে কোনও পার্থক্য না করেই যদি নির্বিচারে সুবিধা বিলি করা হয়, তা হলে সেটা তোষণ ছাড়া আর কিছু নয়।” বিচারপতির মতে, এই ধরনের নীতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একইসঙ্গে বিচারপতির প্রশ্ন, “যদি সরাসরি নগদ স্থানান্তরই নিয়ম হয়ে যায়, তা হলে মানুষ কি আর কাজ করতে আগ্রহী হবে?”

বিনামূল্যে বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে কড়া সুরে মন্তব্য করেন বিচারপতি। শীর্ষ আদালত জানায়, একাধিক রাজ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে বড় জমিদার বা স্বচ্ছল ব্যক্তিরাও বিদ্যুতের জন্য মূল্য দিচ্ছেন না। প্রধান বিচারপতির বক্তব্য, “আপনার যদি কোনও পরিষেবা প্রয়োজন হয়, তার জন্য খরচ করতে হবে। এটা করদাতাদের টাকা।” অর্থাৎ বিনামূল্যে পরিষেবার বোঝা যে শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতার কাঁধেই এসেই পড়বে, সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় আদালত।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, “কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা অবশ্যই সংবিধানসম্মত এবং প্রয়োজনীয়। কিন্তু আর্থিক শৃঙ্খলা ও লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টনের নীতি অমান্য করে যদি নির্বিচারে অনুদান বিলি হয়, তবে তা রাজকোষের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। তার প্রভাব পড়বে পরিকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এই সব খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উপরেও।”

শীর্ষ আদালত স্পষ্ট করেছে, তারা কেবল একটি রাজ্যের কথা বলছে না; গোটা দেশের ক্ষেত্রেই এই প্রবণতা নিয়ে পুনর্বিবেচনার সময় এসেছে। ভোটের রাজনীতিতে জনপ্রিয়তার মোহে ঘোষিত বিনামূল্য প্রকল্প আদতে কতটা টেকসই, সেই প্রশ্নই আরও একবার তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের এই কড়া বার্তার পর রাজ্য সরকারগুলি নিজেদের নীতিতে কোনও পরিবর্তন আনে কি না, সেটাই এখন দেখার।