তালাক-ই-হাসানে ‘সুপ্রিম’ পর্যবেক্ষণ

‘কোনও সভ্য সমাজে কি এমন প্রথা থাকা উচিত?’ – মুসলিম সমাজে প্রচালতি বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম প্রথা তালাক-এ-হাসানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের।

নিজস্ব সংবাদদাতা: সময়টা ২০১৭। অগাস্ট মাস। আজ থেকে ৮ বছর আগে তিন তালাকের অন্যতম তালাক-এ-বিদ্দতকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের নেতৃত্বাধীন ৫ সদস্যের বেঞ্চ ঐতিহাসিক এই রায় দিয়েছিল। যদিও বেঞ্চের পাঁচ বিচারপতি এ বিষয়ে একমত হতে পারেননি। তিন জন বিচারপতি এই রায়ের পক্ষে মত দিয়েছিলেন। বাকি দুই বিচারপতি ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দিয়ে কেন্দ্রকে আইন তৈরির কথা বলেছিলেন। শেষপর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠের বিচারে তালাক-এ-বিদ্দত অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়। বিচারপতি ইউ ইউ ললিত, বিচারপতি আর এফ নরিম্যান এবং বিচারপতি কুরিয়েন জোসেফ তালাক-এ-বিদ্দতকে শুধু অসাংবিধানিক নয়, ইসলাম বিরোধী এবং কোরাণ বিরুদ্ধ বলে মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, এই প্রথা ইসলামে নেই। কোরাণেও এর কোনও উল্লেখ নেই। এর যা কিছু উল্লেখ শরিয়ত আইনে। দেশের সংবিধানের মাপকাঠিতে এই আইনকে বিচার করে দেখা গিয়েছে তালাক-এ-বিদ্দত সম্পূর্ণভাবেই ভারতীয় সংবিধান বিরোধী। যদিও বেঞ্চের বাকি দুই সদস্য, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জে এস খেসর এবং বিচারপতি এস আবদুল নাজির তিন তালাক প্রথাকে সংবিধান বিরোধী বলে মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁদের মত ছিল, ইসলামে যার উল্লেখ রয়েছে তাকে সংবিধান বিরোধী বলাটা ঠিক নয়। তাই তাঁরা চেয়েছিলেন, ওই প্রথার উপর ৬ মাসের জন্য স্থগিতাদেশ দেওয়া হোক। তাঁরা বলেছিলেন, এই বিষয়ে কেন্দ্র নতুন কোনও আইন আনুক এবং যতদিন না সেই আইন রূপায়িত হচ্ছে ততদিন এই প্রথার উপর স্থগিতাদেশ থাক। শেষপর্যন্ত থ্রি ইসটু টু বা তিন-দুইয়ে তাঁদের মত হেরে যায়। সাড়া জাগানো এই মামলায় মামলাকারী অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্যও শোনা হয়েছিল। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ডের আইনজীবী কপিল সিবালের যুক্তি ছিল, তাৎক্ষণিক তিন তালাক বা তালাক-ই-বিদ্দত মুসলিমদের মধ্যে এমনিতেই কমে এসেছে। আদালত এতে হস্তক্ষেপ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। যদিও সেই সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট এবং তাৎক্ষণিক তিন তালাক বা তালাক-এ-বিদ্দতকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে।

এতটা বলার পরে, যদি আপনাদের কারোর মনে প্রশ্ন জাগে, ৮ বছর আগের সেই প্রসঙ্গ নিয়ে এত কথা বলার কী হয়েছে। আছে, অবশ্যই আছে। তা জানার জন্য আ.পনাদের এই ভিডিয়োটা শেষ পর্যন্ত দেখতে হবে। মুসলিম সমাজে তিন ধরনের তালাক প্রথা রয়েছে। তালাক-এ-এহসান, তালাক-এ-হাসান এবং একটু আগে যার কথা বলেছি সেই তালাক-এ-বিদ্দত। মুখে পরপর তিনবার তালাক শব্দ উচ্চারণ করেই স্ত্রীকে বিচ্ছেদ দিতে পারতেন স্বামী। এবার প্রশ্নের মুখে তালাকের বাকি দুই প্রথার মধ্যে একটি তালাক-এ-হাসান নিয়ে। এবার মুসলিম সমাজে প্রচালতি বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম প্রথা তালাক-এ-হাসানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার, ১৯ নভেম্বর, এই সংক্রান্ত এক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের তিন সদস্যের বেঞ্চ মন্তব্য করে, কোনও সভ্য সমাজে কি এমন প্রথা থাকা উচিত। না, সুপ্রিম .কোর্ট কোনও সিদ্ধান্ত বা রায় জানায়নি। প্রশ্ন তুলেছে।

প্রশ্ন হল, তালাক-এ-হাসান নিয়ে বিতর্ক কেন? মামলাই বা হয়েছে কেন? আসলে এক্ষেত্রেও মুসলিম মহিলাদের অধিকার ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলেই একাংশের মত। তালাক-এ-হাসানও আসলে তালাক-এ-বিদ্দতেরই আর একটি রূপ। এই প্রথা অনুযায়ী, তিন মাস ধরে প্রতি মাসে এক বার করে তালাক উচ্চারণ করলেই একজন স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদ পেয়ে যেতে পারেন। এর বিরোধিতা করে বেশ কয়েকটি মামলা দায়ের হয় সুপ্রিম কোর্টের। মামলা করেছেন বেনজির হিনা নামে এক মহিলাও। তাঁর বক্তব্য, আইনজীবী মারফত তাঁকে তালাক-এ-হাসানের নোটিস পাঠিয়েছেন স্বামী গুলাম আখতার। কিন্তু নথিতে সই করেননি। ফলে বিবাহ বিচ্ছেদের বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি তাঁর ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করতে পারছেন না। গুলাম আখতারের আইনজীবী বলেন, ইসলামে এই প্রথা রয়েছে। তাই রীতিনী.তি বিরুদ্ধ কিছু হয়নি। যা শুনে বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ধর্মের দোহাই দিয়ে কোনও মহিলার সম্মান এভাবে ক্ষুণ্ন করা যায় না। বেনজিরের মতোই মামলাকারী বাকিদের বক্তব্য, এক পাক্ষিক এই প্রথা অবিলম্বে খারিজ করে দিক আদালত। এর প্রেক্ষিতে বিচারপতিরা জানান, প্রয়োজনে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ গঠন করা হবে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা অবশ্য জানানো প্রয়োজন। ২০২২ সালে সুপ্রিম কোর্টেই তালাক-এ-হাসানের এক পৃথক মামলায় আদালতেরই একটি পৃথক বেঞ্চ  জানিয়েছিল, এই প্রথাকে প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য বলা যাবে না।

আবার ফিরে আসি, তাৎক্ষণিক তিন তালাক বা তালাক-এ-বিদ্দতে। ২০১৭ সালে এই প্রথাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তারপর কী হল। বাস্তবে এর কী প্রতিফলন ঘটল। এরপরেও স্বামী যদি এই প্রথা মেনে তালাক দিতে চান তা হলে তার কী সাজা হবে। তাৎক্ষণিক তিন তালাককে .শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচনার জন্য ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা জমা দেয় কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সময় আদালতকে কেন্দ্র জানায়, বিবাহের মতো একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তিন তালাক প্রথা বিপজ্জনক। এটি মুসলিম মহিলাদের জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে। ২০১৯ সালেই সংসদে পাশ হয় মুসলিম মহিলা আইন বা The Muslim Women Protection of Rights on Marriage. এই আইনে তিন তালাককে কগনিজেবল অফেন্স বলা হয়েছে। তবে জামিন যোগ্য বা বেলেবল। আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড হতে পারে। সঙ্গে জরিমানা। জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ। এসব নাকি বিধাতার হাতে পূর্ব নির্ধারিত। তবে বাস্তবের মাটিতে সবকিছুই ঠিক করে সময় ও সমাজ। ভারতীয় সমাজ, বিশেষত মুসলিম সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়। সিনেমা ও সাহিত্যেও আমরা এর ছবি দেখতে পাই। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া নিকাহ সিনেমার কথা নিশ্চয় অনেকেরই মনে হচ্ছে। চল্লিশ বছর আগের এই সিনেমাকে আজও ল্যান্ডমার্ক মনে করা হয়। বি আর চোপড়া পরিচালিত সেই সিনেমায় দেখানো হয়েছিল, ইসলামিক পার্সোনাল ল-এর প্রেক্ষিতে মুসলিম মহিলাদের অধিকারের প্রশ্নটি। সালমা আগা, রাজ বব্বর অভিনীত এই সিনেমা বহু প্রশংসিত হয়। এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। প্রথমে এই সিনেমার নাম রাখা হয়েছিল তালাক তালাক তালাক। কিন্তু আপত্তি জানান ইসলামি ধর্মগুরুরা। তাদের আপত্তিতে সিনেমার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় নিকাহ বা বিবাহ। আজকের এই ভিডিয়ো আপাতত এখানেই শেষ করছি। আমাদের নজর থাকবে তালাক-এ-হাসানের দিকে। সুপ্রিম কোর্টে শেষ পর্যন্ত কী হয়, এই প্রথা বহাল থাকবে নাকি অবৈধ ঘোষিত হবে, তা সময়ই বলবে। তবে মুসলিম মহিলাদের অধিকারের প্রশ্নে, সব ধর্মের সব মহিলার অধিকারের প্রশ্নে, সমানাধিকারের প্রশ্নে যা কিছু পুরাতন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কেউ কেউ বলেন, নতুন মানেই সবকিছু ভালো নয়। আবার পুরাতন মানেই সবকিছু খারাপ নয়।