ইজরায়েলের সংসদে নেসেটে সবার চোখ ছিল শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দিকেই। পুরো বিশ্বজুড়ে লেখা হয় মোদীর ভাষণ ঘিরে।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইজরায়েলের সংসদে দেন এক ভাষণ। সেই ভাষণের শেষে তিনি ঠিক যা বলেছেন। তা যদি মহাত্মা গান্ধী শুনতেন। তাহলে তিনি হয়ত ঘাবড়ে যেতে পারতেন। আর অন্যদিকে জওহরলাল নেহরু অসুস্থ হয়ে যেতেন নিশ্চয়ই। এর পরে আসতে থাকে টুইস্ট মে টুইস্ট। যেটার সূত্রপাত হয় জেরুজালেমের এক পোস্ট দেখে। এই পোস্টে একের পর এক চাঞ্চল্যকর কিছু লেখা থাকে। তবে শুধুমাত্র এই পোস্টেই নয়। পুরো বিশ্বজুড়ে লেখা হয় মোদীর ভাষণ ঘিরে। কারণ ঘটনাই এমন যা চোখ এড়ানোর মতোই নয়। ইজরায়েলের সংসদে নেসেটে সবার চোখ ছিল শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দিকেই। একে একে গ্লোবাল প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধেও জানাব। কিন্তু প্রথমেই যে দিকে নজর দেব, তা হল কী লেখা হয়েছিল জেরুজালেমের পোস্টে। যা ঘিরে সাড়া পড়ে গিয়েছে গোটা বিশ্বে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে বলা একটি শব্দ। কোট করে সেই শব্দটাই লেখা ছিল এই পোস্টে। যেটি হল ‘এম ইজরায়েল চাই’ যেটাকে বাংলায় অনুবাদ করলে হবে ইজরায়েল জিন্দাবাদ। এবার বলব মহাত্মা গান্ধী কেন ঘাবড়ে যেতেন আর জহর লাল নেহেরু কেন অসুস্থ হয়ে যেতেন। অসুস্থতা বা ঘাবড়ে যাওয়া সবটাই হল জেরুজালেমের পোস্টে থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাষণের শেষটায়।
কারণ জওহরলাল নেহরু ও মহাত্মা গান্ধী সহিংস আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। দুজনেই এই বিদেশ নীতি মেনে চলতেন। ভারতও মহাত্মা গান্ধীর এই নীতি বহু সময় ধরে মেনে চলেছিল। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ইজরায়েলের সঙ্গে কোনওরকম কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়েই ওঠেনি ভারতের। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইজরায়েল সফরের শেষ দিনে ভাষণের শেষে যা বলেছেন, তা মহাত্মা গান্ধীর নীতির একেবারেই সমর্থন করে না। এর পরেই সাড়া পরে যায় বিশ্বজুড়ে।
ওয়াশিংটনের পোস্টেও বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয় এইদিকে। যেখানে বলা হয়, নরেন্দ্র মোদীর এই কথা ভারতের বিদেশনীতির সঙ্গে মেলে না। পোস্টে লেখা হয়, বুধবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইজরায়েলের সংসদে সাড়ম্বরে স্বাগত জানানো হয়। এটাও বলা হয় মোদীর সময়ে ভারত ও ইজরায়েল বেশ কাছাকাছি এসেছে। এর মানে ভারতের বিদেশ নীতিতে বদল এসেছে। ঠিক যেরকম আগে দেখা গিয়েছিল ভারত ও ফিলিস্তিনীয়দের মধ্যে। ভারত ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ইজরায়েলের সঙ্গে কোনওরকম ডিপ্লোমেটিক সম্পর্ক বানায়নি।
মোদীর ইজরায়েল সফর দুই দেশের মধ্যে আর্থিক, সুরক্ষা, সংযোগ ব্যবস্থকে আরও উন্নত করবে। আশা করা যায়, এর ফলে ইজরায়েলের অন্তরাষ্ট্রীয় সংযোগ বাড়বে। ঠিক যেরকমভাবে অন্তরাষ্ট্রীয় সংযোগ বেড়েছিল ইজরায়েলের। সময়টা হবে ওই ২০২৩ সালের অক্টোবরে। গাজার সঙ্গে যুদ্ধের সময়ে।
এখানেই শেষ নয়। প্রধানমন্ত্রীর ইজরায়েল সফরের আগে বেশ কিছু পরিবর্তন আসে ইজরায়েল সংসদে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আগে ইজরায়েলের সংসদের বাইরে বিশেষ রং করা হয়। ভারতের পতাকার তেরঙা রঙে সেজে ওঠে সংসদের বাইরেটা। এর পরেই একাধিক সংবাদপত্রে আর্টিকেল লেখা হয়। বিদেশেও ভারতের কতটা প্রভাব রয়েছে। তার কিছুটা ইঙ্গিত দেয় এই পদক্ষেপ। বা এই ব্যাপারটাকে উল্টোভাবেও বলা যায়। ভারত ইজরায়েল বা মধ্য পূর্ব দেশগুলির সঙ্গে একটা ভারসাম্যপূর্ণ আচরণের চেষ্টা করছে।
তবে এসব তো ভালো কথাই। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক ভালো হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বাড়বে। কিন্তু ওই যে একটা রয়েছে। কারোর পৌষ মাস তো কারোর সর্বনাশ। এর ফলে চিন্তায় পড়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এইরকম সম্পর্ক ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে, ট্রাম্পের প্রভাব কমতে পারে। ভারতের প্রভাব দৃঢ হতে পারে মধ্য পূর্ব দেশগুলিতে। দেখতে গেলে, এখনও পর্যন্ত ভারতের বিদেশি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অতটাও শক্তিশালী নয় বাকি দেশের তুলনায়। কিন্তু দেখতে গেলে, যুদ্ধ এখন টেকনোলজিক নির্ভর হয়েছে। সেখান থেকে দেখতে গেলে, ভারতের কাছে অত ভালো টেকনিক্যাল সরজ্ঞাম নেই। যার জন্য সে যুদ্ধ তুরি মেরে জিতে যেতে পারে ভারত। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে ইজরায়েল ভারতকে সাহায্য করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে গলফ নিউজের এক রিপোর্টে উঠে আসে দুদেশের সম্পর্ক। যেখানে বলা হয়, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আর ও ওনার স্ত্রী ঠিক যেভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার থেকে বোঝা যায়. আগের থেকে কতটা ভালো হয়েছে দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক। এখানেও বলা হয়, ভারত বরাবর ফিলিস্তিনীয়দের সমর্থন করে এসেছে। কিন্তু ১৯৯২ সালের আগে ভারতের সঙ্গে ইজরায়েলের কোনও সম্পর্ক ছিলই না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্ক ভালো হয়েছে। আরও এক সংবাদ মাধ্যম বলছে মোদী তাঁর ভাষণে গাজায় হয়ে যাওয়া হামলা নিয়ে একটিও শব্দ খরচ করেননি। তাই মনে করা হচ্ছে, মোদীর কাছে সম্পর্ক দৃঢ করা হল একটা স্ট্যাটেজি মাত্র। যা ইকোনমি ও আইডিওলজিক্যাল অবশ্য।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইজরায়েল সফর সারেন এবং সেখান থেকে তিনি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য বড় ঘোষণা করেন। ইজরায়েলকে সম্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান , ইজরায়েল এবং ভারতের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আরও জানান , দুটি দেশ শীঘ্রই এটি চূড়ান্ত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী মোদীর ঘোষণার মাত্র কয়েকদিন আগে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সংক্রান্ত প্রথম দফার বৈঠক ২৩ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল। ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা এই বৈঠকে উভয় দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে যে, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে শীঘ্রই দুই দেশ একমত হতে পারে।