নজরকাড়া কেন্দ্র দমদম উত্তর

একদিকে অভিজ্ঞতার ভরসায় তৃণমূল প্রার্থী, অন্যদিকে বিজেপির চ্যালেঞ্জ আর বামেদের তরুণ মুখ।

অনুসূয়া দাস, সাংবাদিক : দ্বিতীয় দফার ভোটে অন্যতম নজরকাড়া কেন্দ্র দমদম উত্তর । প্রচারের শেষ লগ্নে এখানে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। কারণ স্পষ্ট। এই আসনে বরাবরই দড়ি টানাটানির লড়াই চলেছে। কখনও তৃণমূল, কখনও বাম। পালাবদলের ইতিহাসই বলে দিচ্ছে, একচুল জমি ছাড়তে নারাজ কোনও পক্ষই। এবারও ছবিটা আলাদা নয়। একদিকে অভিজ্ঞতার ভরসায় তৃণমূল প্রার্থী, অন্যদিকে বিজেপির চ্যালেঞ্জ আর বামেদের তরুণ মুখ। সব মিলিয়ে এবারে এই কেন্দ্র এখন এক টানটান ত্রিমুখী লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু।

২০১১ সালে তৃণমূল এই আসনে জিতেছিল। ২০১৬ সালে সিপিআই(এম) আসনটি পুনরায় জেতে। তবে ২০২১ সালে আবার তৃণমূল আসনটি জিতে নেয়। মানে এই আসনে বরাবরই দড়ি টানাটানি জারি রয়েছে। এক চুলও জায়গা ছাড়তে নারাজ কেউই। তবে কার্যত বলাই যায়. এই কেন্দ্রের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক হেভিওয়েট প্রার্থীর ক্যারিশমা। হ্যাঁ .. ঠিকই…ক্যারিশমা। ২০১১-এ তিনি এই কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের প্রতীকে জেতেন। ২০১৬ তে কেন্দ্রটি হাতছাড়া হয়ে যায় তৃণমূলের। তবে নিজের ক্যারিশমায় ২০২১-এ পুণরায় সেই আসন ছিনিয়ে নেন এই হেভিওয়েট নেত্রী। এবারেও তাই অন্য কোনও প্রার্থী নয়, তৃণমূল সুপ্রিমো তাঁর কাঁধেই দায়িত্বভার তুলে দিলেন দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের। আর যার ক্যারিশমার কথা এতক্ষণ আলোচনা হল, তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। রাজনৈতিক জীবন শুরু ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ছাত্র রাজনীতি। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে মূল রাজনীতিতে উঠে আসা। পেশাগতভাবে একজন আইনজীবী। কলকাতা হাইকোর্টে দীর্ঘদিন প্র্যাকটিস চালিয়েছেন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর তিনি প্রথমবার বিধায়ক। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন। স্বাস্থ্য, আইন ও অর্থ দফতরে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য পরিচিত। তিনি আর কেউ নন, তিনি হলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। এবারেও তাঁর কাঁধেই রয়েছে দমদম উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের।

অন্যদিকে এখানে এবারের সিপিএম প্রার্থী তরুণ প্রজন্মের লড়াকু মুখ তথা ছাত্রনেত্রী দীপ্সিতা ধর। তরুণ মুখ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা, আন্দোলনের রাজনীতি এবং শিক্ষিত শহুরে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলবে। এসবই তাঁকে আলোচনায় রাখছে। বিশেষ করে বাম ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করা এবং নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে তিনি একটা আলাদা স্পেস তৈরি করার ক্ষমতা রাখছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তাঁর প্রচারে রয়েছে অভিনবত্ব। যেমন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিদিকে বলো-র আদলে চালু করেছেন, ডিডি-কে বলো। মানে দীপ্সিতা ধর থেকেই ডিডি ভাবনার সূচনা। প্রচারের মাঝে কোনওরকম টেনশন ধরা পড়ছে না কথায়। চেনা ছটফটে, সপ্রতিভ মেজাজ সঙ্গী করে ছুটছেন। শুধু ভোট প্রার্থনায় নয়, ছুটছেন মানুষের মন জিততেও। হঠাৎ করেই বামপন্থীদের গলায় শোনা যাচ্ছে নতুন স্লোগান, দুই প্রধানের একই স্বর, ভোট ফর দীপ্সিতা ধর। বৈশাখী রোদে শুরু করে সারাদিনের প্রচারের পরে ক্লান্ত শরীর। হয়তো চোখ জুড়িয়ে আসছে ঘুমে। গলাও ভেঙেছে, কিন্তু দাপট কমেনি দীপ্সিতার ।

এক সময়ে তন্ময় ভট্টাচার্যের জেতা আসনে এবারে দীপ্সিতা ধরের উপর দায়িত্ব দিল বাম। বামেদের আবেগের জায়গায় যেমন আছে, তেমনই বাস্তবের পরীক্ষাও বাকি।
উল্টোদিকে বিজেপির প্রার্থী সৌরভ শিকদার দমদমের প্রাক্তন সাংসদ প্রয়াত তপন শিকদারের ভাইপো। সাংগঠনিক সূত্রে যিনি বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীনেরও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ৷ প্রথমবার এখানে পদ্মফুল ফোটাতে তিনিও মরিয়া। পুরোদমে চালাচ্ছেন প্রচার। প্রয়াত তপন শিকদারের ছায়াকে সঙ্গী করে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি প্রার্থী সৌরভ শিকদার। কাকার চেনানো অলিগলি ঘুরে অনুন্নয়নের অভিযোগের সঙ্গে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে সামনে রেখে নিউ ব্যারাকপুর অঞ্চলে প্রচার চালাচ্ছেন সৌরভ। প্রচারে দিল্লি, মুম্বই বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকার উদাহরণ তুলে ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্রিক মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সৌরভ।

জমা জল থেকে পানীয় জল, খোলা নর্দমা, বেহাল রাস্তাঘাট ও নিকাশি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বেহাল দশার সঙ্গে মশার উপদ্রব, স্থানীয় একাংশের নেতাদের দাদাগিরি, পুকুর ভরাট, বেআইনি নির্মাণ নিয়ে একের পর এক অভিযোগ তুলে বিজেপি ও সিপিএম ভোট প্রচারে ছুটছে। আর তৃণমূল মনে করাচ্ছে ১৫ বছর আগে উত্তর দমদমের কী অবস্থা ছিল, আর এখন মানুষের জীবনযাত্রার মান কতটা উন্নত হয়েছে তা নিয়ে। প্রচারের বাইরে কী করে নিজের পক্ষে ভোট টানা যায় সেই স্ট্র্যাটেজি নিয়েও তিন পক্ষ শুরু করেছে কাটাছেঁড়া । ২০২১ থেকে ২০২৪-র নিরিখে এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট বেড়েছে ১৩ হাজারের একটু বেশি। শাসকের ঘাড়ের কাছে তারা নিঃশ্বাস ফেলছে। সিপিএমেরও এই কেন্দ্রে নিজস্ব ভোট ব্যাঙ্ক রয়েছে। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে টানটান থ্রিলারের যবনিকা উঠবে আগামী ৪ মে।