তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিন বামেদের প্রার্থী

দলের একাংশের দাবি, স্থানীয় স্তরে যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং কাজ করছেন, তাদের উপেক্ষা করে নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, তারা মানতে রাজি নন।

বিশ্বজিত দেবনাথ, নিজস্ব সংবাদদাতা : নদীয়ার কালীগঞ্জে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রার্থী ঘোষণাকে ঘিরে বড়সড় অশান্তির ছবি সামনে এল। অভিযোগ, প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় নিজেদের দলীয় কার্যালয়েই ভাঙচুর চালালেন সিপিএম-এর একাংশ কর্মী। এই ঘটনা শুধু স্থানীয় স্তরে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং নির্বাচনের আগে দলীয় অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কতটা গভীর, তারও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঘটনাটি ঘটেছে নদীয়া জেলার কালীগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে, যেখানে সোমবার সিপিএম তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে। সূত্রের খবর, প্রার্থী হিসেবে যাঁর নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁকে ঘিরেই দলের ভিতরে তীব্র আপত্তি তৈরি হয়। আর সেই আপত্তিই পরিণত হয় সরাসরি বিক্ষোভে। মঙ্গলবার সকালে দলীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন একাংশ কর্মী-সমর্থক, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় স্লোগান, প্রতিবাদ, এবং পরে তা ভাঙচুরে গড়ায়। চেয়ার-টেবিল ভাঙা, ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা- সব মিলিয়ে কার্যত তছনছ হয়ে যায় পার্টি অফিস। এই ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনের সময় এক সহিংস ঘটনার কথা সামনে আসে, যেখানে অভিযোগ ছিল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকের ছোড়া বোমার আঘাতে মৃত্যু হয় তামান্না নামের এক বালিকার। সেই ঘটনায় গুরুতরভাবে ভেঙে পড়েন তাঁর মা সাবিনা ইয়াসমিন। এই ঘটনার পর বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন দলই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে।

এই প্রেক্ষাপটেই সিপিএম এবারের নির্বাচনে তামান্নার মা সাবিনা ইয়াসমিনকে প্রার্থী হিসেবে সামনে আনে। দল মনে করেছিল, এই প্রার্থী নির্বাচন একদিকে সহানুভূতির ভোট টানতে পারে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বার্তাও দেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দলের একাংশ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তাদের দাবি, স্থানীয় স্তরে যারা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং কাজ করছেন, তাদের উপেক্ষা করে বাইরের বা নতুন মুখকে প্রার্থী করা হয়েছে, যা তারা কোনওভাবেই মানতে রাজি নন। বিক্ষোভকারী কর্মীদের দাবি স্পষ্ট- প্রার্থী বদল করতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, দলীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় নেতৃত্ব বা কর্মীদের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে ক্ষোভ ধীরে ধীরে জমে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত তা বিস্ফোরিত হয় আজকের এই ভাঙচুরের ঘটনায়। অনেকেই মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা নির্বাচনের আগে দলের সংগঠনগত দুর্বলতাকে সামনে এনে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, এই ঘটনার ফলে স্থানীয় ভোটারদের মনেও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে- দল নিজের ভেতরের সমস্যাই যদি সামাল দিতে না পারে, তাহলে তারা কতটা কার্যকরভাবে প্রশাসন চালাতে পারবে। একইসঙ্গে, সহানুভূতির ভিত্তিতে প্রার্থী নির্বাচন কতটা বাস্তবসম্মত, সেটাও নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। কারণ একদিকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, অন্যদিকে নির্বাচনী রাজনীতিতে সংগঠন এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতাও সমানভাবে জরুরি। এখন দেখার বিষয়, এই পরিস্থিতিতে সিপিএম নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নেয়। তারা কি কর্মীদের চাপে পড়ে প্রার্থী বদল করবে, নাকি নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকবে- এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়। কারণ এই সিদ্ধান্ত শুধু কালীগঞ্জ কেন্দ্রেই নয়, বরং গোটা রাজ্যে দলের রাজনৈতিক বার্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে, নদীয়ার কালীগঞ্জের এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ছে। তবে সেই সঙ্গে দলগুলির অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও সামনে আসছে আরও স্পষ্টভাবে। এখন নজর থাকবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং এই অশান্তির প্রভাব নির্বাচনী সমীকরণে কতটা পড়ে।