তামিলনাড়ুর নির্বাচনের ফলাফল প্রায়শই নির্ধারিত হয় নেতৃত্বের ভাবমূর্তি, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, জাতিগত সমীকরণ, জোট এবং ভোটারদের আবেগঘন সংযোগের মাধ্যমে।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : এরাজ্যের পাশাপাশি তামিলনাড়ুতেও ২৩শে এপ্রিল বিধানসভা ভোট। আসন্ন ভোটে ‘হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার’ বিতর্কটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০-র ত্রি-ভাষা সূত্রকে কেন্দ্র করে ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন রাজ্যে দুই-ভাষা নীতি অর্থাৎ মাতৃভাষা তামিল ও ইংরেজি ভাষা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কোনো অবস্থাতেই হিন্দি মেনে না নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। এই ভাষা বিতর্কটি ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণে নির্বাচনের অন্যতম মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে ।
এই রাজ্যে একদফাতেই ভোটগ্রহণ হবে ২৩ এপ্রিল। মোট ২৩৪টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এবং সরকার গঠনের জন্য যেকোনো জোটের ১১৮টি আসন প্রয়োজন। তামিলনাড়ুর রাজনীতি বরাবরই স্বতন্ত্র। এখানে আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য রয়েছে এবং নির্বাচনের ফলাফল প্রায়শই নির্ধারিত হয় নেতৃত্বের ভাবমূর্তি, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, জাতিগত সমীকরণ, জোট এবং ভোটারদের আবেগঘন সংযোগের মাধ্যমে।এই নির্বাচনটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে কারণ রাজ্যে একাধিক রাজনৈতিক শক্তি তাদের ভিত্তি প্রসারিত করার চেষ্টা করছে। শাসক দল ডিএমকে এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে আরও একটি শক্তিশালী মেয়াদ চায় । অন্যদিকে এডিএমকে-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পালানিস্বামীর নেতৃত্বে ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করছে । একই সময়ে, ছোট দল এবং নতুন জোট এই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইগুলোকে প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৬ সালের তামিলনাড়ু নির্বাচন মূলত দুটি প্রধান রাজনৈতিক জোটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।লড়াই মুলত শাসক ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট SPA ও এডিএমকে-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে ।বর্তমানে তামিলনাড়ু শাসন করছে ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ প্রগতিশীল জোট এসপিএ। ২০২১ সালের নির্বাচনে এই জোট ১৫৯টি আসন জিতে এম কে স্ট্যালিনকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। বর্তমানে এককভাবে ডিএমকে-র দখলে রয়েছে ১৩৩টি আসন, যা দলটিকে রাজ্য বিধানসভার সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পালানিস্বামীর নেতৃত্বাধীন এডিএমকে জোটই প্রধান বিরোধী দল। ২০২১ সালে এডিএমকে ৬৬টি আসন জিতলেও, পদত্যাগ, রাজনৈতিক পালাবদল এবং অভ্যন্তরীণ রদবদলের কারণে বিধানসভায় তাদের বর্তমান আসন সংখ্যা ৬০-এ নেমে এসেছে।
প্রথমেই আসা যাক ডিএমকে নেতৃত্বাধীন SPA জোটের কথায়। মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে ডিএমকে শাসক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর ফ্রন্টে রয়েছে কংগ্রেস, বাম দলগুলো, ভিসিকে এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদাররা।যারা এর সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিধিকে শক্তিশালী করে। ডিএমকে-র বড় সুবিধা হলো শহর ও গ্রাম উভয় নির্বাচনী এলাকা জুড়ে গভীর নেটওয়ার্ক,। যেখানে সমর্থনকে ভোটে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে বুথ-স্তরের সংগঠন প্রায়শই একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে।২০২৬ সালের নির্বাচনের জন্য, জোটটি তার জনকল্যাণমূলক পরিষেবা বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী, গণপরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষাকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলোকে। এবার আসা যাক এডিএমকে জোট প্রসঙ্গে,বিরোধী জোটের নেতৃত্বে রয়েছে পালানিস্বামী। পশ্চিম তামিলনাড়ু এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু অংশে এডিএমকে-র এখনও একটি অনুগত ভোটার ভিত্তি রয়েছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে সরকারবিরোধী মনোভাবই মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।বিশেষ করে ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার উদ্বেগ এবং কিছু গ্রামীণ এলাকায় জনগণের অসন্তোষকে ঘিরে।
দুটি প্রধান জোট ছাড়াও, বেশ কয়েকটি ছোট দল ২০২৬ সালের নির্বাচনে নীরবে আসন পরিবর্তনকারী শক্তি হয়ে উঠতে পারে। যদিও তারা এককভাবে বিপুল সংখ্যক আসন জিততে পারবে না। তবে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাদের প্রভাব জয়ের ব্যবধানকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে।বিজেপি, পিএমকে-র বিভিন্ন গোষ্ঠী, এনটিকে, টিভিকে এবং অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলো প্রচলিত ভোটব্যাঙ্কে ভাগ বসিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
প্রশ্ন হল, ভোটাররা শাসনে ধারাবাহিকতা, বিরোধী দলের প্রত্যাবর্তন, নাকি উদীয়মান শক্তিগুলোর মাধ্যমে আরও খণ্ডিত রাজনৈতিক বার্তা বেছে নেবেন। যেহেতু শহুরে ভোটার, তরুণ পেশাজীবী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং নারী সুবিধাভোগী—সকলেই চূড়ান্ত রায়কে প্রভাবিত করতে পারেন, যা বেশ চ্যালেঞ্জিং ।