খিচুড়ি, ভাত-ডাল, ডিম-সবজি থেকে কিনা সোজা বিরিয়ানি ?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : স্কুলের মিড-ডে মিল মানেই খিচুড়ি, ভাত-ডাল, সবজি কিংবা সপ্তাহে এক-দু’দিন ডিম- এটাই তো এতদিনের পরিচিত ছবি। কিন্তু এবার সেই ছবিই কি বদলাতে চলেছে? যেখানে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখনও মিড-ডে মিলে ডিম থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়েই রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, সেখানে এক রাজ্য ভাবছে আরও বড় পদক্ষেপের কথা। ভাবা হচ্ছে, সরকারি স্কুলের পড়ুয়াদের সপ্তাহে অন্তত একদিন খাওয়ানো হবে চিকেন বিরিয়ানি। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। তামিলনাড়ু সরকারের এই অভিনব পরিকল্পনা এখন সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কেন এমন সিদ্ধান্তের কথা ভাবছে রাজ্য সরকার? এর পিছনে কী ইতিহাস রয়েছে? কত টাকা খরচ হবে? সত্যিই যদি এই পরিকল্পনা কার্যকর হয়, তাহলে দেশের শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচিতে কি নতুন অধ্যায় শুরু হবে?
কী প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী?
তামিলনাড়ুর স্কুল শিক্ষামন্ত্রী রাজমোহন সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের কাছে একটি বিশেষ প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারি স্কুলের মিড-ডে মিল কর্মসূচিতে সপ্তাহে অন্তত একদিন চিকেন বিরিয়ানি পরিবেশন করা হোক। এই প্রস্তাব এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে বলেই জানা গেছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
শিক্ষামন্ত্রীর মতে, শুধু পেট ভরানো নয়, শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য এবং স্কুলে উপস্থিতির হার বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। অনেক শিশু এমন পরিবার থেকে আসে, যেখানে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার পাওয়া সম্ভব হয় না। সেই কারণেই মিড-ডে মিলকে আরও আকর্ষণীয় এবং পুষ্টিকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তামিলনাড়ুর মিড-ডে মিলের দীর্ঘ ইতিহাস
ভারতে মিড-ডে মিলের সফল মডেল বলতে প্রথমেই যে রাজ্যের নাম উঠে আসে, তা হলো তামিলনাড়ু। এই কর্মসূচির ইতিহাস কয়েক দশকের পুরনো।
কে কামরাজের হাত ধরে সূচনা
১৯৫০-এর দশকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে কামরাজ প্রথম সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিল চালু করেন। সেই সময় লক্ষ্য ছিল, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলমুখী করা। কারণ, অনেক শিশু শুধুমাত্র খাবারের অভাবেই স্কুলে আসত না।
এরপর কীভাবে বদলেছে প্রকল্প?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিটি সরকার এই প্রকল্পে নতুন সংযোজন করেছে। করুণানিধি মিড-ডে মিলে ডিম যোগ করেন। এম জি রামচন্দ্রন বা এমজিআর এই কর্মসূচিকে পুষ্টিকর আহার প্রকল্পে পরিণত করেন। পরে জয়ললিতা ডিম দেওয়ার সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেন। অর্থাৎ, প্রতিটি সরকারই এই প্রকল্পকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করেছে।
এবার নতুন সংযোজন চিকেন বিরিয়ানি?
এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী চাইছেন, শিশুরা সপ্তাহে অন্তত একদিন চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার সুযোগ পাক। কারণ, এতে যেমন প্রোটিনের পরিমাণ বাড়বে, তেমনি শিশুদের কাছে স্কুলের খাবার আরও আকর্ষণীয় হবে।
শুধু বিরিয়ানি নয়, বদলাবে সকালের খাবারও
সরকার শুধু মিড-ডে মিলেই পরিবর্তন আনতে চাইছে না। সকালের খাবারের মেনুতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে অনেক স্কুলে উপমা, রাভা উপমা, এ ধরনের খাবার দেওয়া হয়। শিক্ষামন্ত্রীর মতে, এই একঘেয়ে মেনুর পরিবর্তে আরও সুস্বাদু, বৈচিত্র্যময় এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়া উচিত।
বর্তমানে কত টাকা খরচ হয়?
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রতি পড়ুয়ার জন্য বর্তমানে প্রায় ১৫ টাকা খাদ্য বাবদ বরাদ্দ রয়েছে। চিকেন বিরিয়ানি চালু হলে এই বরাদ্দ বাড়ানো হতে পারে। যদিও এখনও সরকার এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেনি।
২০২২ সালে আরও একটি বড় পদক্ষেপ
তামিলনাড়ু শুধু মিড-ডে মিলেই থেমে থাকেনি। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাথমিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য শুরু হয় প্রাতরাশ প্রকল্প। পরে এর নাম রাখা হয় পেরুনথালাইভার কামরাজার প্রাতরাশ প্রকল্প। ফলে অনেক শিশু এখন স্কুলে সকালের খাবার এবং দুপুরের খাবার- দুটিই পাচ্ছে।
এর ফলে কী লাভ হয়েছে?
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধরনের প্রকল্পের ফলে স্কুলে উপস্থিতির হার বেড়েছে। অপুষ্টির হার কমেছে। অনেক দরিদ্র পরিবারের উপর খাবারের আর্থিক চাপও কমেছে। এছাড়া পড়াশোনায় মনোযোগও বাড়ে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
দেশজুড়ে কেন আলোচনা?
চিকেন বিরিয়ানির প্রস্তাব সামনে আসতেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে আলোচনা। একাংশ বলছেন, শিশুদের পুষ্টির জন্য এটি অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। অন্যদিকে, অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, এতে সরকারের খরচ কত বাড়বে? সব স্কুলে কি একইভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও ভবিষ্যতের হাতে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কবে?
বর্তমানে প্রস্তাবটি মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায়। সবুজ সংকেত মিললেই তামিলনাড়ুর মিড-ডে মিলের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
ভারতে মিড-ডে মিল শুধু একটি খাবার কর্মসূচি নয়, এটি শিশুদের পুষ্টি, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তামিলনাড়ুর নতুন প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা শুধু একটি নতুন খাবার যুক্ত হওয়ার ঘটনা হবে না, বরং দেশের অন্যান্য রাজ্যের জন্যও একটি নতুন আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার, মুখ্যমন্ত্রী বিজয় এই প্রস্তাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেন কি না।