শুরু হচ্ছে ২০ দলের বিশ্বকাপ। ভারত ও শ্রীলঙ্কার আটটি স্টেডিয়ামে হবে মোট ৫৫টি ম্যাচ। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে প্রথম দিনই বিশ্বকাপের উত্তেজনা। গ্রুপ পর্বের বিন্যাসেও রয়েছে আকর্ষণ। ভারত রয়েছে গ্রুপ এ-তে।

রিয়া দাস, সাংবাদিক: সময় বদলেছে, দল বদলেছে, কিন্তু স্বপ্নটা এখনও বদলায়নি একই আছে। ১৯ মাস আগে ব্রিজটাউনের সেই ঐতিহাসিক রাত আজও ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে টাটকা। মাঠের মাঝখানে রোহিত শর্মার হাতে জাতীয় পতাকা। একটা প্রজন্মের বিশ্বাস তখন চোখের সামনে বাস্তব হয়েছিল। সেই বিশ্বাসই ফের খুঁজছে ভারত, তবে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চেহারা, ভিন্ন এক নেতৃত্বে। ৭ মার্চ শুরু হতে চলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তাই শুধুই একটি টুর্নামেন্ট নয়, এটি ভারতের ক্রিকেট-রূপান্তরের পরীক্ষাও। এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নেই রোহিত, নেই বিরাট। এই অনুপস্থিতিই ভারতের নতুন বাস্তবতা। কিন্তু এই শূন্যতার জায়গায় তৈরি হয়েছে সাহসী ভবিষ্যৎ। সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বে এই ভারত নামের চেয়ে ছন্দে বেশি বিশ্বাসী। অভিষেক শর্মা, তিলক বর্মা, যশস্বী জয়সওয়ালদের আগ্রাসী ব্যাটিং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতের নতুন পরিচয় গড়ে দিয়েছে। বোলিং বিভাগে বৈচিত্র্য, ফিল্ডিংয়ে তৎপরতা এবং ম্যাচের মাঝখানে ভয় না পাওয়ার মানসিকতা। এই তিন শক্তির উপর দাঁড়িয়েই নজির গড়ার স্বপ্ন দেখছে ভারত। তবে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ মানেই চাপের বোঝা। প্রত্যাশার ভার, সমর্থকদের আবেগ। এই সবকিছুই সামলে খেলতে হয় খেলওয়াড়দের। ইতিহাস বলছে এখনও পর্যন্ত কোনও দেশ পরপর দুবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার হাতছানি এবার ভারতের সামনে। কিন্তু এই পথ মোটেও সহজ নয়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউ জিল্যান্ড প্রতিটি দলই অভিজ্ঞ, শক্তিশালী।

এবারের বিশ্বকাপের নাটকীয়তা শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিতর্ক শুরু হয়েছে মাঠের বাইরেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। যা ক্রিকেট বিশ্বে প্রশ্ন তুলেছে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে। তাদের জায়গায় স্কটল্যান্ডের সুযোগ পাওয়া যেমন চমক, তেমনই অস্বস্তিকর। বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে পাকিস্তান ভারত-ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জয় শাহদের সামনে তাই শুধু ট্রফি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নয়, কূটনৈতিক চাপ সামলানোর পরীক্ষাও। এই টানাপোড়েনের মাঝেই শুরু হচ্ছে ২০ দলের বিশ্বকাপ। ভারত ও শ্রীলঙ্কার আটটি স্টেডিয়ামে হবে মোট ৫৫টি ম্যাচ। কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে প্রথম দিনই বিশ্বকাপের উত্তেজনা। গ্রুপ পর্বের বিন্যাসেও রয়েছে আকর্ষণ। ভারত রয়েছে গ্রুপ এ-তে।

আধুনিক ক্রিকেটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও উত্তেজনাপূর্ণ ফরম্যাট টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট। দ্রুত রান, টানটান উত্তেজনা আর অপ্রত্যাশিত ফল। এই তিন মিশেলেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আজ ক্রিকেটপ্রেমীদের অন্যতম বড় আকর্ষণ। চলুন দেখে নেওয়া যাক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ সালে। আয়োজক দেশ ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দল ছিল ভারত।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপঃ বিজয়ী তালিকা
২০০৭ সাল
ফাইনাল- ভারত বনাম পাকিস্তান
ভারত (জয়ী)
২০০৯ সাল
ফাইনাল- পাকিস্তান বনাম শ্রীলঙ্কা
পাকিস্তান (জয়ী)
২০১০ সাল
ফাইনাল- ইংল্যান্ড বনাম অস্ট্রেলিয়া
ইংল্যান্ড (জয়ী)
২০১২ সাল
ফাইনাল- ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম শ্রীলঙ্কা
ওয়েস্ট ইন্ডিজ (জয়ী)
২০১৪ সাল
ফাইনাল- শ্রীলঙ্কা বনাম ভারত
শ্রীলঙ্কা (জয়ী)
২০১৬ সাল
ফাইনাল- ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ড
ওয়েস্ট ইন্ডিজ (জয়ী)
২০২১ সাল
ফাইনাল- অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ড
অস্ট্রেলিয়া (জয়ী)
২০২২ সাল
ফাইনাল- ইংল্যান্ড বনাম পাকিস্তান
ইংল্যান্ড (জয়ী)
২০২৪ সাল
ফাইনাল- ভারত বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা
ভারত (জয়ী)
মোট শিরোপা সংখ্যা দেশ অনুযায়ী, ভারত ২ বার (২০০৭, ২০২৪), ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২ বার (২০১২,২০১৬), ইংল্যান্ড ২বার (২০১০,২০২২), পাকিস্তান একবার (২০০৯), শ্রীলঙ্কা একবার (২০১৮) আর অস্ট্রেলিয়া একবার (২০২১)। বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত নতুন নাম ইতালি। ফুটবলে চার বারের বিশ্বজয়ী দেশটি প্রথম বার ক্রিকেট বিশ্বকাপে পা রাখছে। অধিনায়ক ওয়েন ম্যাডসেনের জীবনকাহিনী যেন ক্রিকেট বিশ্বায়নের প্রতীক। একসময় তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে হকি বিশ্বকাপ খেলেছেন, আজ ইতালির হয়ে ক্রিকেট খেলছেন। নেপাল, নামিবিয়া, ওমান, কানাডা, আমেরিকার মতো দেশগুলির উপস্থিতি প্রমাণ করছে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে শক্তির সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখানে দুটি ওভারই ইতিহাস বদলে দিতে পারে। শিরোপার দৌড়ে ভারতের সবচেয়ে বড় বাধা অস্ট্রেলিয়া। ক্রিকেট মানেই অস্ট্রেলিয়া। নাম যাই থাকুক, মানসিকতায় তারা অজেয়। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং গভীরতা ও অলরাউন্ডার শক্তি তাদের ভয়ঙ্কর করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা ধারাবাহিক, আফগানিস্তান অপ্রত্যাশিত। নিউজিল্যান্ড কিছুটা ছন্দহীন হলেও একক দক্ষতায় ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা রয়েছে কনওয়ে, ফিলিপস, স্যান্টনারদের।
সবশেষে প্রশ্ন একটাই, ভারত কি পারবে? তরুণদের সাহস, ঘরের মাঠের সমর্থন আর নতুন নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাস যদি এক সুতোয় বাঁধা যায়, তবে অসম্ভব বলে কিছু নেই পৃথিবীতে। বিতর্ক, বয়কট আর রাজনীতির ছায়া পেরিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটটাই কথা বলে তাহলে হয়তো আবারও কোনও এক রাতে ভারেতর ক্রিকেটপ্রেমীরা দেখবে মাঝমাঠে উড়ছে তেরঙা, ইতিহাসের পাতায় লেখা হচ্ছে আরও এক নতুন অধ্যায়।