ইলেকশন কমিশন বা নির্বাচন কমিশন। যার দায়িত্ব দেশে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে সংসদ, বিধানসভা এবং রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা।অর্থাৎ গোটা দেশের নির্বাচন করানোর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনারের ওপর থাকে।সেই নির্বাচন কমিশনারের কাছে যদি নিজের পরিচয় প্রমানের নোটিশ আসে? তাহলে? কে পেল এই নোটিশ ? কোন তথ্যে খামতি?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্কঃ
দিল্লিতে বর্তমানে বিশেষ ভোটার তালিকা যাচাইকরণ এবং সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। যেখানে নোটিশ পাঠানো হয়েছে ইলেকশন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুকে।কেন জানেন ? কেননা ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য যে ফর্ম জমা দিয়েছিলেন, সেখানে তাঁর নাম লেখা ছিল ‘Dr S S Sandhu’। কিন্তু পূর্বের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নথিভুক্ত ছিল ‘Sukhbir Singh Sandhu’ হিসেবে। নোটিশ পাঠানো হয়েছে তাঁর ছেলেকেও। শুধু এই দুজনই নয়,তালিকায় রয়েছে লালকৃষ্ণ আডবানি,বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর,প্রাক্তণ উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনকরের মত একাধির উচ্চপদস্থের নাম।ভাবুন তো যেখান ছাড় পাচ্ছেন না কমিশনার সহ এই সমস্ত উচ্চ পদের মানুষজন। সেখানে কি অবস্থা হবে দিল্লির ৩৩ লক্ষ সাধারন নাগরিকের।যা এই ধরনের নোটিশ পেয়েছেন? এই প্রশ্ন এই জন্যই উঠছে,কেননা সুত্রের খবর, এই সান্ধু সহ আরও একজন ইলেকশন কমিশনার নিজেদের কমিশনেরই সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি বা অবজেকশন জানিয়েছেন।আর এই বিষয়টি সামনে আসার পরই সরব হয়েছেন বিরোধীরা। সরব হয়েছেন ভোটের চুরির অভিযোগে।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি চিফ ইলেকশন কমিশনারকে দেশদ্রোহী পর্যন্ত বলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আদৌ কি দেশে ভোট হচ্ছে? নাকি এটি ভোটার তালিকার সংশোধন? আরও একটি প্রশ্ন জোড়াল হচ্ছে, যদি কমিশনের অন্দরে সব নিট অ্যান্ড ক্লিন থাকে তাহলে দুজন কমিশনার কেন কমিশনের সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার লিখিত অবজেকশন জানিয়েছেন? আজকে আমারা আলোচনা করব ভোটচুরির গল্পটা আসলে কি?
এবার এই বিষয়টি আলোচনার আগে প্রথমে আপনাতে বুঝতে হবে,এই এসআইআর কি?যাকে নিয়ে এত সমস্যা। ভোটার লিস্ট যাচাই করার পদ্ধতি হচ্ছে এই এসআইআর।যেখানে নির্বাচন কমিশনের তরফে ভোটার তালিকা থেকে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত ও ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে তালিকাটি নিখুঁত ও আপডেট করার একটি নিয়মিত ও বিশেষ প্রক্রিয়া।এবার এতদুর সবকিছু স্বচ্ছ ও স্পষ্ট।সমস্য তখন হচ্ছে বাছাই চালানোর সময় বৈধ ভোটাররাও তালিকার বাইরে চলে যাচ্ছেন।যার নজির বিধানসভা নির্বাচনের আগে এ রাজ্য়ে আমরা দেখেছিলাম। দিল্লিতেও সেই একই ছবি ধরা পড়ছে। এসআইআরের আগে দিল্লির জনসংখ্য়া ছিল ১ কোটি ৪৫ লক্ষ,১০ হাজার ২৯৯। ঘরে ঘরে গিয়ে যাচাইয়ের পর ৩১শে অগষ্ট যে তালিকা প্রকাশ পায় তাতে ৪৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭২২ জনের নাম ছিল না।যাদেরকে স্থানান্তরিত,মৃত,অনুপস্থিত ও দুই জানায় একই ব্যক্তির নাম থাকার কারন হিসাবে দেখানো হয়। এর মধ্যে যে ৯৭ লক্ষ,৫৩ হাজার,৫৭৭ ভোটারকে বাছাই করা হয়ে তাদের মধ্যে ৩৩ লক্ষ ১৩ হাজার ভোটারকে নোটিশের জন্য বেছে নেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই নোটিশগুলি কিসের ওপর ভিত্তি করে পাঠানো হয়?
কমিশনের সফ্টওয়্যারে আপনার নাম,বয়স, বাবার নাম -সবকিছু পুরনো রেকর্ড অনুয়ায়ী আছে। যেখানে কোথাও বানান আলাদা,কোথাও বয়স ঠিক নেই, কোথাও আগের এসআইআর লিস্টে আপনার বা আপনার পরিবারের নাম পাওয়া যায়নি।তো নোটিশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এইরকই ১১টি ভিন্ন বিয়য়ে কম্পিউটার সিস্টেমে যখনি কিছু ভুল ধরা পড়ে তখনই শুরু হয় এই নোটিশের গল্প। যেমন ইলেকশন কমিশনে Sukhbir Singh Sandhu-র নামের অমিলে নোটিশ, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাকে বয়সের অমিলে নোটিশ পাঠানো হয়।আগের লিস্টে কপিল সিব্বলের নাম না থাকায় নোটিশ পাঠানো হয়।প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন বিবেক দেবরয়,যিনি ২০২৪ শে প্রয়াত হয়েছেন,ওনার নামও নোটিশের তালিকায় নথিভুক্ত হয়।যদিও ইলেকশন কমিশনের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে নোটিশ পাওয়া মানেই নাম কাটা নয়।দিল্লির চিফ ইলেকট্রলার দফতরের অফসারের তরফে জানানো হয়েছে,এটা শুধু ডেটা ঠিক করার এক প্রক্রিয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যেমন বলা হচ্ছে সেরকম কোন সমস্যা নেই। নোটিশের পুরো লিস্ট ইলেকশন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। এটাও সত্যি ইলিকশন কমিশনার সান্ধুর তথ্য যাচাইয়ের পর বৈধ তালিকায় নাম রাখা হয়েছে।মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তারও সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। এখানেই প্রশ্ন তুলছে সাধারন মানুষের। ইলেকশন কমিশনারের ঝামেলা মিটে গেছে,মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তারও তাই। এরা হচ্ছেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।এনাদের পরিচিতি আছে। এনাদের নিয়ে সংবাদমাধ্যমে খবর করা হয়। খবর হতেই গোটা সিস্টেম এদের ফাইল দেখে নেয়। কিন্তু যারা রিক্সা ও ঠেলা চালায়,দিন মজুরের মত দিন আনি দিন খাই মানুষজন , তাদের কি হবে?পেট চালানোর দায়ে গ্রাম থেকে এসে দিল্লিতে থাকছেন অনেকে। এদের পরিবারের সদস্যরাও অতি সাধারন। যাদের নামে নোটিশ এসেছে। অগত্যা দৈনিক রোজগার ছেড়ে কাগজ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে চক্কর কাটতে হবে।যদি না যায় তাহলে নাম কেটে যাবে এসআইআর লিস্ট থেকে।আর যদি যায় কাজের ক্ষতি হয়ে যাবে।
বিরোধীদের ভোট চুরি ইভিযোগ বিচার ও আলোচনা সাপেক্ষ। তবে এই গোটা প্রক্রিয়ায় উচ্চপদস্থের নাম এলেও সেখানে দ্রুত সমাধান হচ্ছে।অন্তত দিল্লির ক্ষেত্রে তেমনটাই স্পষ্ট। তবে সমস্যায় পড়ছেন সাধারন দিন আনি দিন খাই মানুষ।কেননা তাদের কাছে এই সমস্ত জটিল বিষয় সমাধানে কোনও জায়গা নেই। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা।