অবিরাম স্ক্রলিং ও তথ্যের স্রোত মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। এমন ইঙ্গিতও মিলছে নানান গবেষণায়। গভীর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : সোশ্যাল মিডিয়া মানেই ঝকঝকে দুনিয়া। বিশ্বের কাছে নিজের স্টেটাস, নিজের প্রতিপত্তি দেখানোর প্রতিযোগিতার পর্যায়ে পৌঁছেছে এই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা খানিকটা আসক্তির চেহারা নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ শতাংশ কিশোর কিশোরীর ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। যা একেবারে জনস্বাস্থ্য সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ডোপামিনের ফাঁদ
আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, সেগুলি নির্মিত হয়েছে ‘ডোপামিন লুপ’-এর ভিত্তিতে। ছোট ছোট ভিডিও, হঠাৎ হঠাৎ ‘লাইক’ বা নোটিফিকেশনের ঝলক—সব মিলিয়ে এমন এক অনিশ্চিত পুরস্কার-ব্যবস্থা, যা মস্তিষ্কে জুয়া বা মাদকাসক্তির মতোই প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বিশেষ করে বেড়ে ওঠা মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বেশি। অনলাইনে ক্রমাগত তাৎক্ষণিক তৃপ্তির পরে অফলাইন হলেই এক ধরনের ‘ডোপামিন ঘাটতি’ তৈরি হয়। এর ফলে অস্থিরতা, বিরক্তি, অকারণ উদ্বেগ বাড়ে।
অবিরাম স্ক্রলিং ও তথ্যের স্রোত মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। এমন ইঙ্গিতও মিলছে নানান গবেষণায়। গভীর মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়ার অভ্যাস চিন্তার গভীরতাকে প্রতিস্থাপিত করছে।

সংযোগের ভিড়েও একাকীত্ব
যত বেশি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘কানেক্টেড’, তত বেশি নিঃসঙ্গতা। সাজানো-গোছানো ‘হাইলাইট রিল’ অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা টেনে আনে। ‘কম্পেয়ার অ্যান্ড ডিসাপেয়ার’—এই মানসিকতা বিশেষ করে কিশোরদের মধ্যে তীব্র। সাম্প্রতিক সমীক্ষায় প্রায় ৪৬ শতাংশ কিশোরী জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া তাদের শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
ভারতের অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬ সতর্ক করেছে—অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম উৎপাদনশীলতা ও মানসিক স্থিতি ক্ষুণ্ণ করছে। টেক্সট-নির্ভর যোগাযোগের বাড়বাড়ন্তে মুখোমুখি কথোপকথনের দক্ষতা কমছে; বাস্তব জীবনের আলাপচারিতা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে।
রয়েছে সাইবার বুলিং-এর অন্ধকারও। ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী এর শিকার। এই ২৪ ঘণ্টার হয়রানির চক্র ভুক্তভোগীদের আত্মক্ষতির ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দিচ্ছে—এ এক ভয়াবহ বাস্তব।
সমাধান: ডিজিটাল হাইজিন
প্রশ্ন হল, পথ কোথায়? কেবল স্ক্রিন-টাইম কমানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ‘ডিজিটাল হাইজিন’-এর সংস্কৃতি।
প্রথমত, বয়সভিত্তিক কঠোর নীতি—শিশু ও কিশোরদের জন্য নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার। দ্বিতীয়ত, পরিবারে ‘টেক-ফ্রি’ অঞ্চল—খাওয়ার টেবিল বা শোবার ঘর যেন স্ক্রিনমুক্ত থাকে। ঘুমের ব্যাঘাতের অভিযোগ ইতিমধ্যেই অর্ধেকের বেশি কিশোরীর। তৃতীয়ত, স্কুলে ডিজিটাল সাক্ষরতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা জরুরি।
ডিজিটাল দুনিয়া স্থায়ী। তাকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু এই দুনিয়া যেন আমাদের সন্তানের মনোজগতে কুপ্রভাব না ফেলতে পারে। এমনটা হলে আগামী প্রজন্ম হবে সর্বদা অনলাইনে যুক্ত। অথচ ভিড়েও একা।