রাজনৈতিক সংকট ঢাকতে আন্তর্জাতিক সংঘাতকে ব্যবহার করা হচ্ছে?

সূচনা পল্যে, সাংবাদিক : ওয়াশিংটনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝড়ের নাম- এপস্টিন ফাইলস। লক্ষ লক্ষ নথি প্রকাশের পর আমেরিকার রাজনীতি কার্যত উত্তাল। কিছু নথি প্রকাশ পেলেও আরও অনেক ফাইল এখনও গোপন বা আংশিকভাবে ব্ল্যাকআউট করে রাখা হয়েছে। আর ঠিক এই সময়েই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে এক নতুন উত্তেজনা- পশ্চিম এশিয়ায় সামরিক সংঘাত, ইরানে হামলা আর ভেনেজুয়েলার মতো দেশকে ঘিরে নতুন ভূরাজনৈতিক চাল। ফলে প্রশ্ন উঠছে- এটা কি শুধুই কাকতালীয়? নাকি রাজনৈতিক সংকট ঢাকতে আন্তর্জাতিক সংঘাতকে ব্যবহার করা হচ্ছে? এই বিতর্ককে ঘিরেই এখন ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত।

Epstein Files কী এবং কেন এত বিতর্ক ?
জেফ্রি এপস্টিন- একজন ধনী ফিনান্সিয়ার কিন্তু তার নাম জড়িয়ে আছে বিশ্বের অন্যতম বড় যৌন পাচার ও ক্ষমতাশালী নেটওয়ার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে। দীর্ঘ তদন্তের পর সম্প্রতি Epstein Files Transparency Act অনুযায়ী লক্ষ লক্ষ নথি প্রকাশ করা হয়। এই নথিগুলোতে উঠে এসেছে-
প্রভাবশালী ব্যবসায়ী
রাজনীতিবিদ
আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে এপস্টিনের যোগাযোগের তথ্য
তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়। কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কিছু নথি আবার ব্যাপকভাবে রেডাক্ট বা কালো করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- সরকার কি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু তথ্য লুকিয়ে রাখছে?

ওয়াশিংটনে রাজনৈতিক চাপ
এই ঘটনাকে ঘিরে এখন মার্কিন প্রশাসনের উপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের দুই দলের নেতারাই এখন প্রশ্ন তুলছেন-
কেন সব ফাইল প্রকাশ করা হচ্ছে না
কেন কিছু তদন্ত নথি এখনো গোপন রাখা হয়েছে
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের উপর রাজনৈতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে।
“Wag the Dog” তত্ত্ব
এই বিতর্কের মাঝেই উঠে এসেছে একটি পুরনো রাজনৈতিক তত্ত্ব। এর নাম- Wag the Dog Doctrine। এই তত্ত্ব অনুযায়ী- কোনও সরকার যদি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ কেলেঙ্কারিতে পড়ে, তাহলে সেই সংকট থেকে জনমত সরাতে আন্তর্জাতিক সংঘাত তৈরি করতে পারে। ইতিহাসে এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। আর এখন সেই একই অভিযোগ উঠছে বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে।
ইরানে সামরিক হামলা
সম্প্রতি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ সামরিক পদক্ষেপে ইরানে হামলা চালানো হয়েছে। এই হামলার পরই নতুন করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। সমালোচকদের মতে- এই সামরিক পদক্ষেপের সময়টা অত্যন্ত সন্দেহজনক। কারণ ঠিক সেই সময়েই Epstein Files নিয়ে ওয়াশিংটনে তীব্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে।
কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া
এই পরিস্থিতিতে মার্কিন কংগ্রেসের অনেক সদস্য সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন। রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান Thomas Massie একটি মন্তব্য করে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেন। তিনি বলেন- “পৃথিবীর অন্য প্রান্তে বোমা ফেললে Epstein Files হারিয়ে যাবে না।” এই মন্তব্য ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উস্কে দেয়।
বিরল রাজনৈতিক ঐক্য
এই বিতর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- বিভিন্ন মতাদর্শের নেতারা একসঙ্গে প্রশ্ন তুলছেন। রিপাবলিকান নেতা থমাস মেসি এবং ডেমোক্র্যাট নেতা Ro Khanna দুজনেই দাবি করেছেন- যে কোনও সামরিক পদক্ষেপের আগে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। তাদের মতে- সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের।
জনমতের পরিবর্তন
এই ঘটনার ফলে আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যেও সন্দেহ বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন- বিদেশনীতি হয়তো জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে উঠছে। এই ধরনের ধারণা তৈরি হলে সরকারের উপর মানুষের বিশ্বাস কমে যায়।
Epstein Files এর আন্তর্জাতিক দিক
এখানেই গল্পের আরেকটি অদ্ভুত দিক রয়েছে। Epstein Files এর কিছু নথিতে দাবি করা হয়েছে- এপস্টিন আন্তর্জাতিক কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। এমনকি কিছু নথিতে উল্লেখ রয়েছে- ইরানের কিছু সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হয়েছিল। এছাড়াও মার্কিন পারমাণবিক নীতি নিয়ে কথাবার্তার উল্লেখ রয়েছে। যদিও এই তথ্যগুলো এখনো পুরোপুরি যাচাই করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাব
যদি বিদেশনীতি রাজনৈতিক সংকট ঢাকার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে তার প্রভাব শুধু আমেরিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে-
আন্তর্জাতিক কূটনীতি
মিত্র দেশগুলোর বিশ্বাস
বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে
কারণ অন্য দেশগুলো তখন প্রশ্ন তুলতে শুরু করে- এই সামরিক পদক্ষেপ সত্যিই নিরাপত্তার জন্য, নাকি রাজনৈতিক স্বার্থে?
বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে- এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রশাসনের জন্য একটি credibility crisis তৈরি করতে পারে। কারণ যদি মানুষ মনে করে যে যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান কেবল রাজনৈতিক কৌশল- তাহলে সেই সরকারের সিদ্ধান্তের উপর আস্থা কমে যায়।
সবমিলিয়ে Epstein Files বিতর্ক এখন শুধু একটি অপরাধ তদন্তের বিষয় নয়। এটি এখন- রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। সমালোচকদের মতে- যুদ্ধ কখনোই কোনও কেলেঙ্কারি ঢাকার উপায় হতে পারে না। কারণ যুদ্ধের ধোঁয়ার আড়ালেও সত্য শেষ পর্যন্ত সামনে এসেই পড়ে। এখন দেখার- মার্কিন প্রশাসন কি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার পথে হাঁটে,
নাকি এই বিতর্ক আরও গভীর রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়।