কেউ ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আবার তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। যেন হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য আতঙ্ক !

রিয়া দাস, সাংবাদিক : হাজার মাইল দূরে ইরান-ইজরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। কিন্তু তার উত্তাপ যেন ধীরে ধীরে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে। ভোরের আলো ফোটার আগেই বাংলাদেশের বিভিন্ন শহর ও জেলায় পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে তৈরি হচ্ছে অস্বাভাবিক ভিড়। কেউ ধৈর্য ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আবার তেল না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। যেন হঠাৎ করেই এক অদৃশ্য আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীদিনে জ্বালানি দাম বাড়বে কি না, তেল পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তা থেকেই আগেভাগেই জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গিয়ে দেখা যাচ্ছে অনেক জায়গাতেই নির্ধারিত সীমার মধ্যে তেল দেওয়া হচ্ছে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক তেল পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও আবার তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সাময়িকভাবে পাম্প বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ। কেউ কেউ অভিযোগ করছেন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। তবে পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে আগের মতো তেল সরবরাহ না হওয়ায় এই চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি গুজব ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহ করতে চাইছেন। ফলে হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে গেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলাতেও একই চিত্র দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতির পিছনে রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার উত্তপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতি। ইরান ও ইজরায়েলের চলমান সংঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্ববাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। পশ্চিম এশিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহকারী অঞ্চল। তাই সেখানে যুদ্ধ শুরু হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা শুরু করে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায় বা ঝুঁকির মধ্যে পড়ে তাহলে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ তেল বিশ্ববাজারে যায় ব্যাহত হতে পারে। এর প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্ব অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদানের খরচ বাড়বে, বাস ও ট্রাকের ভাড়া বাড়বে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়ে যাবে। এতে পণ্য পরিবহণ ব্যয় বাড়বে ও বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও বাড়তে শুরু করবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে। অর্থাৎ তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে, আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। চাল,ডাল,সবজ্বি থেকে শুরু করে তেল, গম বা চিনির মতো আমদানি নির্ভর পণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে বাজারে দ্রব্যমূল্যের চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। তার ওপর যদি নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের দৈনন্দিন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। বাজারে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলবে। সামনেই ইদ। আর এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি র চাহিদাও হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। এর মধ্যেই সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা অনেকেই আগেভাগে তেল সংগ্রহ করতে চাইছেন, ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ইদের আগে যদি জ্বালানির দাম বাড়ে তাহলে তার প্রভাব পড়বে পরিবহন ভাড়া থেকে শুরু করে বাজারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও। তাই উৎসবের আনন্দের ঠিক যেন অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তার ছায়া যেন ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে বাংলাদেশের জনজীবনে। শুধু জ্বালানি নয়, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশ যেহেতুন রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতির দেশ। তাই বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে বাংলাদেশের রপ্তানিও চাপের মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান-ইজরায়েলের যুদ্ধের উত্তেজনার প্রভাব এবার দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার জেরে পাকিস্তানে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাকিস্তান নিজেকে বাংলাদেশের বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও বিশ্ববাজারের এই ধাক্কা থেকে তারাও রেহাই পায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়ার এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতেও আরও বড় চাপ তৈরি হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি পশিম এশিয়ার এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে শুধু পাকিস্তান নয় দক্ষিণ এশিয়ার আরও অনেক দেশের অর্থনীতিতেই এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি সবসময়ই মানুষের জীবযাত্রার উপর প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হওয়াটা এখন প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মানেই শুধু বেশি টাকা দিয়ে তেল কেনা নয়, এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে জীবনের প্রায় প্রতিটি খাতে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, ফলে বাস-ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়তে থাকে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। চাল, ডাল, সবজি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের অনেক পণ্যের দামও ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। এতে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যায় এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ বেশিরভাগ দেশই জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সেই ধাক্কা সরাসরি এসে পড়ে তাদের অর্থনীতিতে। যেখানে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন, উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার খরচও বাড়তে থাকে। আর সেই ধারাবাহিক প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর, যা পুরো অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।