সিঁদুরে ফুটে ওঠে দেবীর পায়ের ছাপ! ১৬ দিন ধরে চলে পুজো

দুর্গাপুজো মানেই শুধু চার দিনের উৎসব নয়। বাংলার মাটিতে এমন কিছু পুজো আজও বেঁচে আছে যেখানে উৎসবের সঙ্গে মিশে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস। রাজপরিবারের পরম্পরা আর এমন কিছু আচার, যার রহস্য আজও মানুষের কৌতূহল বাড়ায়। পুরুলিয়ার কাশীপুরে পঞ্চকোট রাজপরিবারের দুর্গাপুজো তেমনই এক ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। এখানে দেবী দুর্গা পূজিতা হন মাত্র চার দিন নয়, টানা ১৬ দিন ধরে। আর এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য রাজরাজেশ্বরী দেবীর অষ্টধাতুর চতুর্ভুজা মূর্তি, প্রাচীন বলি প্রথা, বিশেষ গুপ্ত আচার এবং সন্ধিক্ষণে সিঁদুরের উপর দেবীর পায়ের ছাপ ফুটে ওঠার প্রচলিত বিশ্বাস।

গৌতম প্রামাণিক, নিজস্ব সংবাদদাতা

পরম্পরা মেনে কৃষ্ণা নবমীর দিন থেকেই কাশীপুরের দেবী বাড়ির ঠাকুরদালানে শুরু হয়ে গেল পঞ্চকোট রাজবংশের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। পঞ্জিকা অনুযায়ী, আদ্রা নক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণা নবমীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় বিশেষ পুজো। প্রাচীন রীতি মেনে প্রথমে হয় বিগ্রহের বিশেষ স্নানপর্ব। এরপর শাস্ত্রীয় মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। পুজো-পাঠের পর রয়েছে ছাগবলি দেওয়ার প্রথাও। দিনের নির্দিষ্ট আচার শেষ হলেও সন্ধ্যার আরতি অবশ্য নিত্যদিনের নিয়ম মেনেই চলে। রাজবংশের সূত্র অনুযায়ী, কৃষ্ণা নবমী থেকে মোট ১৬ দিন ধরে চলে এই বিশেষ পুজো।

এই পুজোর কেন্দ্রবিন্দু পুরুলিয়ার কাশীপুরের রাজবংশের কুলদেবী রাজরাজেশ্বরী। অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি চতুর্ভুজা এই দেবীমূর্তি সারা বছরই দেবী বাড়ির মন্দিরে অধিষ্ঠিত থাকেন। অন্যান্য দুর্গাপুজোর তুলনায় এখানকার পুজোর রীতি অনেকটাই আলাদা। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাবণ বধের উদ্দেশ্যে শ্রীরামচন্দ্র ১৬ দিন ধরে দেবীর আরাধনা করেছিলেন সেই প্রথাকেই অনুসরণ করে পঞ্চকোট রাজবংশে ১৬ দিন ধরে দেবীর পুজো হয়ে আসছে তাই এই পুজো ষোড়শ কল্পের পুজো নামেও পরিচিত ষোড়শ কল্পের ষোড়শী রূপে দেবীর আরাধনা করা হয় এখানে রাজবংশীয় ও ইতিহাসে এই পুজোর সূচনাকে প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো বলে প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, তৎকালীন জঙ্গলমহলের রাজা গুলেল সিংহকে পরাজিত করে দামোদর শেখর সিংহদেও বাহাদুর চাকলা পঞ্চকোট নামে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি রঘুবংশের ক্ষত্রিয়কূলজাত ধারনগরের মহারাজা বিক্রমাদিত্যের বংশধর ছিলেন বলেও রাজবংশীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সেই পরম্পরা মেনেই তিনি অষ্টধাতুর তৈরি চতুর্ভুজা দেবী রাজরাজেশ্বরী শিখরবাসিনীর আরাধনা শুরু করেছিলেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। সময়ের সঙ্গে রাজপরিবারের ইতিহাস বদলেছে, রাজবাড়ির জৌলুস কমেছে, কিন্তু দেবী আরাধনার সেই প্রাচীন পরম্পরা আজও টিকে রয়েছে। এই পুজোর আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল এর গুপ্ত আচার। রাজপরিবারের পুরোহিত গৌতম চক্রবর্তী ও পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য অনুযায়ী, অষ্টমীর সন্ধিক্ষণের সময় সোনার একটি যন্ত্রে রাখা সিঁদুরের উপর দেবীর পায়ের ছাপ ফুটে ওঠে। এমনই একটি প্রাচীন বিশ্বাস ও রীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। রাজপরিবারের তরফে এই ঘটনাকে পূর্বপুরুষদের পাওয়া দেবীর স্বপ্নাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিশ্বাস অনুযায়ী, সন্ধিক্ষণের সেই বিশেষ সময়ে দেবী নিজেই সেখানে অধিষ্ঠান করেন এবং সিঁদুরের উপর তাঁর পায়ের ছাপ রেখে যান। বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও রাজপরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই রীতি তাঁদের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে রয়েছে।

অষ্টমীর সন্ধিক্ষণের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও ছিল এক বিশেষ প্রাচীন পদ্ধতি। আগে একটি পাত্রে জল রাখা হত এবং তার মধ্যে থাকত ছোট ছিদ্রযুক্ত আরেকটি পাত্র। সেই পাত্রের ছিদ্র দিয়ে নির্দিষ্ট সময় ধরে জল ভর্তি হওয়ার প্রক্রিয়াকে একপাট হিসেবে গণনা করা হত। এই প্রাচীন পদ্ধতি অনুসরণ করেই সন্ধিক্ষণের নির্ঘণ্ট নির্ধারণ করা হত বলে রাজবংশীয় সূত্রে জানা যায়। বর্তমানে সেই পদ্ধতি আর কার্যকর নেই। পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন আচার এখনও নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে। শুধু আচারেই নয়, ভোগের ক্ষেত্রেও এই পুজোর রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। রাজবংশের পুরোহিতের বক্তব্য অনুযায়ী,


এখনও বলি প্রথা রয়েছে ও দেবীর ভোগে মাছ ও মাংস নিবেদন করা হয়।অষ্টমীর দিন ‘শ্রীনাদ মন্ত্র’ পাঠেরও প্রচলন রয়েছে, যাকে অত্যন্ত গুপ্ত মন্ত্র হিসেবে মনে করা হয় এই সমস্ত রীতিই পঞ্চকোট রাজপরিবারের দুর্গাপুজোকে অন্যান্য পুজোর থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। কৃষ্ণা নবমী থেকে শুরু হওয়া বিশেষ পুজোর পর্ব কয়েকটি ধাপে এগিয়ে চলে। রাজবংশের তরফে জানানো হয়েছে, বোধন থেকে পরবর্তী কয়েক দিন বিশেষ পুজোর নিয়ম থাকে। সাধারণ পুজোর পর্ব চললেও পরবর্তী অমাবস্যা থেকে আরও কয়েক দিন ধরে বিশেষ আচার পালিত হয় ১৬ দিনের এই পুজোই পঞ্চকোট রাজবংশের দুর্গোৎসবের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।মহাসপ্তমী ও মহাষ্টমীর দিন রয়েছে বিশেষ স্নানপর্ব

সময়ের সঙ্গে রাজপরিবারের সেই পুরনো জৌলুস হয়তো অনেকটাই ম্লান হয়েছে। কিন্তু দেবী বাড়ির এই পুজো ঘিরে মানুষের আবেগ আজও অটুট। কারণ এই পুজো শুধু একটি রাজপরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, সংস্কৃতি ও বহু প্রজন্মের স্মৃতি। রাজবংশের উত্তরসূরিরা এখনও পুজোর দিনগুলিতে দেবীমন্দিরে উপস্থিত হন ও পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের যোগসূত্র বজায় রাখেন। আর এই পুজোর আরও একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল রাজবংশের পুজো হলেও নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনে সাধারণ মানুষের জন্য দেবীমন্দিরের দরজা খুলে যায়। মহাসপ্তমী থেকে প্রায় চার দিন দর্শনার্থীদের অবাধ যাতায়াতের সুযোগ থাকে। ফলে পুজোর আভিজাত্য, প্রাচীন বিগ্রহ ও অনন্য রীতিনীতি চাক্ষুষ করতে দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ কাশীপুরে ভিড় করেন।