দীর্ঘ জল্পনার পর অবশেষে বিজেপি ঘোষণা করেছে তাদের প্রার্থী সোমা ঠাকুরের নাম। ঠাকুরবাড়ির ছোট বৌমা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী।

রিয়া দাস, সাংবাদিক : বাগদার আকাশে এবার রাজনীতির রং যেন একটু আলাদা। এখানে মঞ্চ একটাই কিন্তু চরিত্রগুলো যেন গল্পের বই থেকে উঠে আসা। যেখানে সম্পর্কের সুতোর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ক্ষমতার লড়াই। ভোটের ময়দানে হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছে এক অদ্ভূত নাট্যমঞ্চ। একদিকে বৌদি আর অন্যদিকে ননদ। আর এই দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে বাগদা বিধানসভা কেন্দ্র। যেন অপেক্ষা করছে এক নতুন ইতিহাসের অধ্যায় লেখার জন্য। দীর্ঘ জল্পনার পর অবশেষে বিজেপি ঘোষণা করেছে তাদের প্রার্থী সোমা ঠাকুরের নাম। ঠাকুরবাড়ির ছোট বৌমা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের স্ত্রী। এবার সরাসরি নির্বাচনী লড়াইয়ের নতুন মুখ। এতদিন রাজনীতির আড়ালে থাকা এই পরিচিত নাম এবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে জনতার দরবারে। তাঁর প্রার্থী হওয়া নিছক কাকতালীয় নয় বরং একটি কৌশল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মতুয়া অধ্যুষিত বাগদা কেন্দ্রে ঠাকুর পরিবারের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে শক্ত জমি তৈরি করতে চাইছে বিজেপি এমনটাই ধারণা রাজনৈতিক মহলের।
কিন্তু এই লড়াইয়ের আসল মোড় লুকিয়ে রয়েছে অন্যদিকে। তৃণমূল কংগ্রেস ইতিমধ্যেই প্রার্থী করেছে মধুপর্ণা ঠাকুরকে। যিনি এই কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। আর এখানেই গল্পটা পায় অন্য মাত্রা। কারণ মধুপর্ণা কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী নন। তিনি সোমা ঠাকুরের ননদ, শান্তনু ঠাকুরের বোন। অর্থাৎ একই পরিবারের দুই সদস্য এবার দাঁড়িয়েছেন দুই ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে। মধুপর্ণার মা মমতাবালা ঠাকুর। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী এবং মতুয়া সমাজের অধিকার নিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি রাজ্যসভার সংসদ হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্পর্কের উষ্ণতা আর রাজনৈতিক দূরত্ব। এই দুইয়ের সংঘাতে তৈরি হয়েছে এক বিরল পরিস্থিতি যা সাধারণ ভোটযুদ্ধের বাইরে গিয়ে এক আবেগঘন ও তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার রূপ নিয়েছে। তবে দুই পক্ষই স্পষ্ট করে দিয়েছেন পরিবার এবং রাজনীতি এই দুইয়ের মধ্যে কোনও মেলবন্ধন হবে না। সোমা ঠাকুরের কথায়, পরিবার ও রাজনীতি আলাদা হওয়াই উচিত। আর মধুপর্ণাও জানিয়েছেন সম্পর্ক নিজের জায়গায় কিন্তু ভোটের ময়দানে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হবেই। এই বক্তব্যে যেন পরিষ্কার ভোট ময়দানে ননদ-বৌদির এক অন্য যুদ্ধ দেখতে চলেছে বাগদার মানুষ।
এদিকে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে জোর প্রচার। মধুপর্ণা ইতিমধ্যেই মাঠে নেমে পড়েছেন পুরোদমে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন, নিজের কাজের খতিয়ান তুলে ধরছেন। অন্যদিকে সোমা ঠাকুরও শুরু করেছেন তাঁর রাজনৈতিক সফর। পুজো দিয়ে, জনসংযোগ করে ধীরে ধীরে তৈরি করছেন নিজের অবস্থান। তবে এই পথ যে মসৃণ নয় তা প্রথম দিনেই বুঝে গিয়েছেন তিনি। হেলেঞ্চা বাজারে প্রচারের সময় এক সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, এতদিন কোথায় ছিলেন? এই একটি কথাই যেন রাজনীতির বাস্তবতাকে সবার সামনে এনে দিল। পরিচিতি থাকলেই হয় না, মানুষের আস্থা অর্জন করতে হয়। এই সহজ সত্যটাই যেন আরও একবার প্রমাণিত হল। এবার প্রথম থেকেই বাগদার বিজেপি কর্মী সমর্থকদের দাবি ছিল স্থানীয় কোনও ভূমিপুত্র কিংবা ভূমিকন্যাকে প্রার্থী করতে হবে। এ বিষয়ে তারা নেতৃত্বের কাছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে দাবিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের দাবির মান্যতা না পাওয়ায় অনেকেই ক্ষুদ্ধ। সোমা ঠাকুর বলেন, মতুয়া মহাসংঘ এবং আমার মাতৃসেনার পক্ষ থেকে বাগদায় বহুবার গিয়েছি। বাগদার মানুষের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। আমি নিশ্চিত বাগদার মানুষ আমাকে আপন করে নেবে। ২০২১ সালে বাগদা বিধানসভা নির্বাচনে ৯ হাজার ৭৯২ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির বিশ্বজিৎ দাস। পরে বিশ্বজিৎ দাস দল বদল করে তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় উপনির্বাচন হয় ২০২৪-এ। আর সেই উপনির্বাচনে জয়ী হন মধুপর্ণা ঠাকুর। ৩৩,৪৫৫ ভোটে জয়ী হন। আবার ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি থেকে শান্তনু ঠাকুর ২০,৪৪৫ ভোটে লিড পায়।
এরই মধ্যে এসআইআর নিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন করে উস্কে দিয়েছে বিতর্ক। তৃণমূল এটিকে বড় ইস্যু করতে চাইছে। আর সোমা ঠাকুরের দাবি এই সমস্যা সাময়িক খুব দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। তবে এই ইস্যু যে ভোটের অঙ্কে প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। সব মিলিয়ে বাগদার এই নির্বাচন এখন আর শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, এ যেন এক প্রতীকী যুদ্ধ। এখানে মুখোমুখি হয়েছে অভিজ্ঞতা বনাম নতুন সূচনা, সম্পর্ক বনাম মতাদর্শ। প্রতিদিন, প্রতিটি প্রচারসভা, প্রতিটি মন্তব্য এই লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলছে। সাধারণ ভোটাররাও যেন এই অনন্য পরিস্থিতির সাক্ষী হয়ে উঠেছেন যেখানে তাঁদের এক ভোট ঠিক করে দেবে শুধু একজন প্রার্থীর ভবিষ্যৎ নয় বরং একটি বিরল পারিবারিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণতি। শেষ পর্যন্ত সব প্রশ্ন গিয়ে ঠেকে এক জায়গায় শেষ হাসি কে হাসবেন? নতুন মুখ সোমা ঠাকুর নাকি অভিজ্ঞ মধুপর্ণা ঠাকুর। যিনি ইতিমধ্যেই মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। উত্তর তো জনতার মনে লুকিয়ে আছে। তবে এটুকু নিশ্চিত বাগদার এই লড়াই শুধু একটি কেন্দ্রের নির্বাচন নয় এটি নতুন ইতিহাস গড়তে চলেছে। যার শেষ পাতা খুলবে ভোটগণনার দিন। আর সেই দিনই ঠিক করবে সম্পর্কের টান জিতবে নাকি রাজনীতির হিসেব।