প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ইস্তফার দাবি কেরল কংগ্রেসের!

রাজনৈতিক সংঘাতের আঁচ এবার দেশের বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদেও। দিল্লিতে বিক্ষোভ, পুলিশের বিধিনিষেধ ও ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে যখন জাতীয় রাজনীতিতে উত্তেজনা তুঙ্গে। ঠিক তখনই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে ঘিরে নতুন বিতর্ক। তাঁর একটি মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরাসরি ইস্তফার দাবি জানিয়ে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করল কেরল প্রদেশ কংগ্রেস।শুধু তাই নয়, সেই পোস্টে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে অন্য কাউকে খুঁজে নেওয়ার কথাও বলা হয়। আর এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হয় বিজেপি। বিতর্ক বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত পোস্টটি মুছে ফেলে কেরল কংগ্রেস। একই সঙ্গে ওই পোস্টের জন্য দায়ী ব্যক্তিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথাও জানায় দলের রাজ্য নেতৃত্ব। ঠিক কী ঘটেছিল?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক

সোমবার, দিল্লিতে চলমান বিক্ষোভ ও রাজধানীতে জারি হওয়া বিধিনিষেধ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সেই সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান ‘এটি আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় ও তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না’ প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্যের পরই কেরল কংগ্রেসের,সরকারি এক্স হ্যান্ডল থেকে একটি পোস্ট করা হয়, সেখানে লেখা হয়, ‘প্রিয় সূর্য কান্ত, আইনশৃঙ্খলা যদি আপনার এক্তিয়ারের মধ্যে না পড়ে, তাহলে এখনই পদত্যাগ করুন, আপনার পরিবর্তে এমন কাউকে খুঁজে নেব, যিনি বিষয়টি সামলাতে পারবেন’

এই পোস্ট প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় বিতর্ক। দেশের প্রধান বিচারপতির মতো সাংবিধানিক পদে থাকা একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এভাবে ইস্তফার দাবি তোলা কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে, যখন সুপ্রিম কোর্ট ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন চলছে, তখন এই পোস্টের তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। যদিও কেরল কংগ্রেসের ওই পোস্টকে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখতে নারাজ রাজ্য নেতৃত্ব। বিতর্কের মুখে পড়ে পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। পাশাপাশি, কেরল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি সানি জোসেফ জানান, দলের রাজ্য নেতৃত্বের অনুমতি বা সম্মতি ছাড়াই ওই পোস্ট করা হয়েছিল। যে ব্যক্তি পোস্টটি করেছিলেন, তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও জানিয়েছে দল। কিন্তু ততক্ষণে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে জাতীয় রাজনীতিতে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের অভিযোগ, প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে এমন মন্তব্য বিচার বিভাগের মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে। জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে বিচার বিভাগকে ভয় দেখানোর অভিযোগও তুলেছে বিজেপি।

এমনকি এই বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের সংগঠনগুলিও। প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এই ধরনের মন্তব্য বিচার বিভাগের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে একটি সমাজমাধ্যমের পোস্টকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্ক ক্রমশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও রাজনৈতিক দলগুলির দায়িত্বশীলতা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে। এই বিতর্কের পিছনে রয়েছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এসআইআরকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব বিরোধী দলগুলি। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতেও আন্দোলন করেছে বিরোধী শিবির। সেই সূত্রেই সোমবার দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্ট অভিযানের কর্মসূচি ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে ও এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের মন্তব্য ও তাঁকে ঘিরে কেরল কংগ্রেসের পোস্ট নতুন করে সংঘাত বাড়িয়ে দেয়।

এসআইআর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য বিরোধী জোটের নেতারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই অনুরোধে সম্মতি দেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিচারাধীন। তাই তা নিয়ে আলাদা করে বৈঠক করা ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতির পরিপন্থী হতে পারে। ভারতের সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ নীতি। এই অবস্থান থেকেই প্রধান বিচারপতির মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত। একদিকে বিরোধী শিবিরের আন্দোলন, অন্যদিকে বিচারাধীন বিষয়ে আদালতের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার প্রশ্ন দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে বিচার বিভাগের ভূমিকা। আপানর কী মত? প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কেরল কংগ্রেসের এই মন্তব্য কি রাজনৈতিক সীমা লঙ্ঘন করেছে? নাকি এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতারই অংশ?