অস্ত্রের বাজারে ক্রমশ কোণঠাসা হচ্ছে রাশিয়া। বদলে যাচ্ছে বিশ্বের সমীকরণ।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একসময় বিশ্বের অস্ত্রবাজারের দুটো মেরু ছিল। আমেরিকা না পছন্দ হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরে রাশিয়া ছিল বিকল্প। মিগ বনাম এফ-১৬, এস-৩০০ বনাম প্যাট্রিয়ট—এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলেছিল সামরিক ভারসাম্য। কিন্তু ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই সমীকরণেই বড় ফাটল দেখা দিল।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বিশ্ব অস্ত্র রফতানির প্রায় ৪৩ শতাংশ এখন আমেরিকার দখলে। রাশিয়া নেমে গিয়েছে তৃতীয় স্থানে। ফ্রান্সও তাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এটি কেবল বাজারের ওঠানামা নয়—একটি কৌশলী পুনর্গঠন।
কলকাঠি নাড়ছে আমেরিকা। প্রথমত, ‘ক্যাটসা’ (CAATSA) নিষেধাজ্ঞা আইনের মাধ্যমে রুশ অস্ত্র কেনাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। কোনও দেশ সুখোই যুদ্ধবিমান কিনলে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে। ফলে ইন্দোনেশিয়া, মিশর কিংবা ভারত—অনেক দেশই রুশ চুক্তি পুনর্বিবেচনা করেছে। অর্থাৎ, অস্ত্রের গুণগত মানের কারণে নয়, আর্থিক অভিঘাতের কারণেই রাশিয়ার বদলে আমেরিকার অস্ত্রের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে দেশগুলি।
দ্বিতীয়ত, ‘ইন্টারঅপারেবিলিটি’-র প্রশ্ন। ইউক্রেন যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, আধুনিক যুদ্ধে শুধু অস্ত্র নয়, নেটওয়ার্কই হল মূল শক্তি। এফ-৩৫ কেবল যুদ্ধবিমান নয়, তথ্য-সংযোগের কেন্দ্র। প্যাট্রিয়ট, অ্যাব্রামস—সবই যুক্ত একটি সামরিক জালে। রুশ সরঞ্জাম সেই কাঠামোয় খাপ খায় না। ফলে আমেরিকা কেবল পণ্য নয়, ‘সিস্টেম’ বিক্রি করছে—যার মেয়াদ চার দশক। এতে ক্রেতা দেশ দীর্ঘমেয়াদীভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

তৃতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘প্রদর্শনী মঞ্চ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডনবাসে রুশ ট্যাঙ্ক ধ্বংসের ছবি যেমন ভাইরাল হয়েছে, তেমনই হিমার্স বা প্যাট্রিয়টের সাফল্যও প্রচার পেয়েছে। এর জেরে ইউরোপ ও এশিয়ায় মার্কিন সংস্থাগুলির অর্ডার বেড়েছে বলে দাবি শিল্পমহলের একাংশের।
তবে রাশিয়া পুরোপুরি পিছু হটেনি। পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার মুখে বিকল্প পথ খুঁজছে তারাও। ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কিছু দেশকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার বার্তা, মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে না। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাবও বাড়ছে। ভারত বা চিনের মতো ক্রেতাদের কাছে ‘মেক ইন’ প্রকল্পে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছে মস্কো, যা আমেরিকা মোটেও দেয় না।
ডলারভিত্তিক লেনদেন এড়াতে সোনা, ইউয়ান বা পণ্য বিনিময়ের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়, কিন্তু রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পকে টিকিয়ে রাখাতেই এইধরণের পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হল, অস্ত্রবাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য কি স্থিতিশীলতা আনবে, নাকি নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে? যদি বিশ্বের বড় অংশ একটি দেশের উপর নির্ভরশীল হয়, তবে তা ‘সিঙ্গল পয়েন্ট অফ ফেলিওর’-এ পরিণত হতে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়া যদি কোণঠাসা হয়ে প্রযুক্তি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে বিক্রি শুরু করে, তা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য নতুন বিপদও ডেকে আনতে পারে।
সবমিলিয়ে অস্ত্রবাজারের এই পরিবর্তন কেবল বাণিজ্যের নয়, ভূরাজনীতিরও নতুন অধ্যায়। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে, কূটনৈতিক সমীকরণেও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য।