অবশেষে স্বস্তির দরজা খুলে দিয়েছে আকাশ। মানালি থেকে গুলমার্গ পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডের উচ্চতম অঞ্চলগুলিতে আশীর্বাদ বর্ষণ করছে পশ্চিমীঝঞ্ঝা। তুষারপাতের ফলে শ্বেতশুভ্র বরফের চাদরে ঢেকেছে এলাকাগুলি।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : ডিসেম্বরেই শ্বেতশুভ্র বরফে ঢেকে যাওয়ার কথা ছিল হিমালয়। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস পড়লেও পাহাড়গুলি ন্যাড়া, বাদামী এবং শুষ্ক অবস্থায়ই ছিল। তুষারপাতের খড়া দেখে প্রথমে আতঙ্কিত হয়েছিলেন জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং আপেল চাষীরা। তারপরই চলতি সপ্তাহে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন তাঁরা। অবশেষে স্বস্তির দরজা খুলে দিয়েছে আকাশ। ঝকঝকে আকাশ সঙ্গে তুষারপাত। মানালি থেকে গুলমার্গ পর্যন্ত উত্তরাখণ্ডের উচ্চতম অঞ্চলগুলিতে আশীর্বাদ বর্ষণ করছে পশ্চিমীঝঞ্ঝা। গত ৪৮ ঘণ্টা তুষারপাত কেবলমাত্র পর্যটনকে চাঙ্গা করছে বা ইনস্টাগ্রাম ফিডগুলিকে বাড়তে সাহায্য করছে তা নয়। এটি জলশূন্যতার দ্বারপ্রান্তে থাকা একটি বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ জীবনে ফিরতে সাহায্য করছে।

হিমাচল যখন তুষারপাতের প্রত্যাবর্তন উদযাপন করছে, তখন একটা প্রশ্ন উঠে আসে, এটা কি আদৌ পুনরুদ্ধার? নাকি গভীর ক্ষতের উপর একটা সাময়িক প্রলেপ ?
তাৎক্ষণিক সুস্থতা – একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস
এই তুষারপাতের তাৎক্ষণিক প্রভাব নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ভঙ্গুর হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রের জন্য এই তুষারপাত কেবল একটি দৃশ্য নয় বরং একটি সঞ্চয়ও বটে। এশিয়ার জলের টাওয়ারগুলিকে পূর্ণ করতে সাহায্য করবে এই তুষার। এরপর আগামী বসন্তে এই তুষার গলে গিয়েই ঝর্ণাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করবে। গঙ্গা ও সিন্ধুর উপনদীগুলিতে পুষ্ট করবে এই তুষারগলা ঝর্ণার জল। তারপর আগামী মে মাসে যাতে স্থানীয় শহরগুলো জলশূন্য না হয়ে পড়ে, সেক্ষেত্রেও স্বস্তি দেবে এই বরফ।
আপেল ফলনে প্রয়োজন তুষারপাত- হিমাচল এবং কাশ্মীরে আপেল বলয়ের জন্য এই তুষারপাত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আপেল ফলনের জন্য ঠান্ডার পাশাপাশি আর্দ্রতাও জোগায় এই বরফ। গ্রামীণ অর্থনীতিকে ফসল বিপর্যয়ের মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
অর্থনৈতিক খরা পরিবেশের খরার মতোই তীব্র। তাই তুষারপাত না হওয়ায় আশঙ্কা ছিলই। অবশেষে সেই আশঙ্কাকে মিথ্যে করে হাজার হাজার হোটেল মালিক, গাইড এবং ট্যাক্সি চালকের জীবিকায় নতুন প্রাণ জুগিয়ে তাঁদের মুখে হাসি ফোটাল এই তুষারপাত। ডিসেম্বরে তুষারপাত না হওয়ায় ব্যপক উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটিয়েছেন তাঁরা।
পরবর্তীতে কী আশা করা যায়?
আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা একসঙ্গে একাধিক প্রশ্ন তুলে দেয়। তুষারপাত দেরিতে হলেও ভারী হয়েছে। ২০২৫-২৬ সালের শীতকাল সম্ভবত ঘাটতির বছর হিসেবেই রেকর্ড হয়েছে। ডিসেম্বরের পরিবর্তে জানুয়ারির শেষে তুষারপাত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার সঙ্গে বাড়াছে ঝুঁকিও।

১. হঠাৎ বরফ গলে যাওয়ার ঝুঁকি
এবছর দেরিতে তুষারপাত হয়েছে। মাটি ছিল অপেক্ষাকৃত গরম। ডিসেম্বরে তুষারপাত হলে তা জমে শক্ত বরফ তৈরি হয় এবং হিমবাহকে পুষ্টি জোগায়। কিন্তু জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির শেষে তুষারপাত হলে প্রায়শই আর্দ্র থাকে। সূর্যের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত গলে যায় সেই বরফ। মার্চে নদীর জলস্তর ফুলে উঠলেও, জুন মাসে আবারও জল শুকিয়ে যেতে পারে।
২. ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি-
শুষ্ক, আলগা মাটির উপর হঠাৎ ভারী তুষারপাত হলে যে তুষারস্তর তৈরি হয়, তা মোটেও স্থিতিশীল নয়। ফলে আগামীদিনগুলিতে ভূমিধস এবং হিমবাহ ধসের হার বাড়তে পারে।
৩. কৃষিতে পরিবর্তন
কৃষকরা এতদিন যেভাবে জলবায়ুর উপর নির্ভর করে চাষবাস করতেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে তাতেও পরিবর্তন আসবে। হিমালয়ের কৃষির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে অভিযোজন ক্ষমতার উপর। এখানে চাষবাস নিয়মিত তুষারপাতের উপর নির্ভরশীল। ভারী বর্ষণের জল ধরে রাখার জন্য বরফের স্তুপ তৈরি করা হয় এইসব পাহাড়ি এলাকায়।
সবমিলিয়ে হিমালয়ও বেশ ক্লান্ত। এই সাম্প্রতিক তুষারপাত প্রমাণ করে যে পাহাড় পুরনো পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করতে পারে। কিন্তু একটি ভাঙা সময়সূচীর মাধ্যমে হয়তো সেই পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে।
“হিমালয়ের নিরাময়” হোক। তার জন্য আমাদেরকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে।
পর্যটনের ক্ষেত্রে দায়িত্ববান হতে হবে- প্রতিবার তুষারপাত শুরু হলেই নতুন করে ভ্রমণ চালু করলে পাহাড়ের সংবেদনশীল রাস্তায় যানজট হবে। বাড়বে প্লাস্টিকের আবর্জনা। অবরুদ্ধ হবে পাহাড়ের রাস্তা।
জলের ব্যবস্থাপনা- পাহাড়ি শহরগুলোর নগর পরিকল্পনায় বৃষ্টির জল সংরক্ষণ ও ঝর্ণাকে পুনরুজ্জীবিত করাটা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পাহাড়গুলো নিঃসন্দেহে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। আবারও বরফের সাদা চাদরে ঢেকে যাচ্ছে। এই সৌন্দর্যকে উপভোগ করলেও মাথায় রাখতে হবে, এটি সাময়িক স্বস্তি, স্থায়ী নয়।