সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্যে অমলিন রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো

সময় বদলেছে, বদলেছে পুজোর আয়োজনের ধরন। হারিয়ে গিয়েছে জমিদারি প্রথা। কিন্তু দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের রাসমাঠে রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোয় আজও অমলিন প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ঐতিহ্য। পুরনো রীতি, আচার ও পরম্পরা মেনেই এখনও দুর্গাদালানে হয়ে আসছে দেবীর আরাধনা। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জমিদারি আমলের ইতিহাস, কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের দীর্ঘ সম্পর্ক এবং সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিও।

বিশ্বজিৎ নস্কর, নিজস্ব সংবাদদাতা

পরিবার সূত্রে জানা যায়, জমিদার রাজবল্লভ রায়চৌধুরীর হাত ধরেই এই পুজোর সূচনা। সেই সময় থেকে আজও একই রীতিতে চলে আসছে পুজো। দেবী দুর্গার সঙ্গে থাকেন জয়া ও বিজয়া। বোধনের দিন তিনজন ব্রাহ্মণ একসঙ্গে চণ্ডীপাঠ করেন। প্রতিপদ থেকেই শুরু হয়ে যায় পুজোর প্রস্তুতি। কয়েকশো বছরের পুরনো এই রীতিই এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছে পরিবার।

এই পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীদের সম্পর্ক। কৃষ্ণনগরের পালপাড়ার মৃৎশিল্পী সন্তোষ পালের বংশধররাই বংশপরম্পরায় এই পরিবারের দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে আসছেন। শিল্পী অসীম পাল জানান, একসময় জমিদাররা মৃৎশিল্পীদের থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই রাসমাঠ এলাকায় তাঁদের বসবাস। কথিত আছে, বহু বছর আগে কৃষ্ণনগর থেকে নৌকায় করে বারুইপুরের সদাব্রত ঘাটে এসে নেমেছিলেন মৃৎশিল্পীরা। সেখান থেকেই শুরু হয়েছিল এই পরিবারের প্রতিমা তৈরির কাজ। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু সেই সম্পর্ক আজও অটুট।

এই জমিদারবাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসও। জানা যায়, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একসময় কিছুদিন এই বাড়িতে ছিলেন। এখানেই বসে তিনি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ লেখা শুরু করেছিলেন বলে পরিবারের দাবি। যে টেবিল ও চেয়ারে বসে তিনি লেখালেখি করেছিলেন, সেগুলিও এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে এই বাড়ি শুধু বনেদি পরিবারের স্মৃতি বহন করছে না, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

পুজোর আচারেও রয়েছে প্রাচীনতার ছাপ। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ছাগ বলির রীতি রয়েছে। নবমীর দিন হয় আখ ও কুমড়ো বলি। দশমীতে পরিবারের মহিলারা সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। এরপর শুরু হয় দেবীর বিসর্জনের প্রস্তুতি।

বিসর্জনের দিনও রয়েছে বিশেষ ঐতিহ্য। প্রায় ৪০ জন বাহক কাঁধে করে প্রতিমাকে নিয়ে যান সদাব্রত ঘাটে। সঙ্গে থাকে রুপোর পাখা, চামর ও ছাতা। বনেদি পরিবারের পুরনো আভিজাত্যের ছাপ যেন ফুটে ওঠে সেই শোভাযাত্রায়। প্রতিমা নিরঞ্জনের দিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতিও রয়েছে এই পরিবারের পুজোয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমনকী বিদেশেও ছড়িয়ে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু পুজোর সময় সকলেই ফিরে আসেন এই বাড়িতে। কয়েক দিনের জন্য ফের জমে ওঠে পুরনো জমিদারবাড়ি। ঢাকের বাদ্যি, চণ্ডীপাঠ, পুজোর আচার আর পরিবারের সদস্যদের মিলন—সব মিলিয়ে বারুইপুরের রাসমাঠে রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজো আজও যেন জীবন্ত ইতিহাস। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও সাড়ে তিনশো বছরের এই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়াই এখন পরিবারের অন্যতম অঙ্গীকার।