২০১৪ থেকে ২০২৬, বারো বছর ধরে চলছে বিজেপি শাসন পর্ব। এই সময়ে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে দেশের আধ্যাত্মিক পরিসরও।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : একদিকে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র আরেকদিকে আধ্যাত্মিক পরিসর। সমান্তরাল গতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। বিকাস ভি বিরাসত ভি- উন্নয়ন ও ঐতিহ্যের মিশেল এই মন্ত্রকে সামনে রেখেই সাংস্কৃতিক নবজাগরণের ডাক দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এটা কি স্রেফ জাতীয় আত্মমর্যাদার পুনঃস্থাপন নাকি এর ফলে বাড়ছে সামাজিক বিভাজন ?
২০১৪ থেকে ২০২৬, বারো বছর ধরে চলছে বিজেপি শাসন পর্ব। এই সময়ে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র যেমন বদলেছে, তেমনই বদলেছে দেশের আধ্যাত্মিক পরিসর। অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণ ও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তার প্রাণপ্রতিষ্ঠার ঘটনা বিজেপি সমর্থকদের কাছে কেবলমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, ‘দাসত্বের মানসিকতা’ কাটিয়ে ওঠার মতোই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত—জাতীয় আত্মমর্যাদার পুনঃস্থাপন বলে মনে করছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অযোধ্যার বাইরে বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ করিডর কিংবা উজ্জয়িনীর মহাকাল লোক—এই সব প্রকল্প প্রাচীন তীর্থক্ষেত্রের আধুনিকীকরণ। আধ্যাত্মিকতা এখানে নিছক ভক্তির বিষয় নয়।
আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের আধ্যাত্মিক ব্র্যান্ডিং বেশ চলছে। বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে রাষ্ট্রসংঘ স্বীকৃত আন্তর্জাতিক যোগ দিবস। যোগ, ধ্যান ও ভারতীয় সুস্থতার দর্শন এখন আন্তর্জাতিক বিষয়। “বাসুদৈব কুটুম্বকম”—বিশ্ব এক পরিবার—এই মন্ত্রকে কূটনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারত নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে বিদেশ নীতিকে মিলিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ভারত।

তবে আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে অর্থনীতির যোগও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ‘প্রসাদ’ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় তীর্থক্ষেত্রে প্রায় ১,৯০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। অযোধ্যায় বছরে প্রায় ১৩.৫ কোটি দেশীয় পর্যটক আসছেন—যা দর্শনার্থীর সংখ্যায় তাজমহলকেও ছাপিয়ে গিয়েছে। এই ‘মন্দির অর্থনীতি’ স্থানীয় শিল্প, হস্তশিল্প ও আতিথেয়তা খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। ধর্মীয় পর্যটনের হাত ধরে বহু ঝিমিয়ে পড়া অঞ্চলও অর্থনৈতিকভাবে গতিশীল হতে পেরেছে।
কিন্তু এই আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মীয় বিষয়কে হাতিয়ার করে গেরুয়া উত্থানের সমালোচনা কম হচ্ছে না। বিরোধীদের অভিযোগ, এই হিন্দু জাতীয়তাবাদ ভারতের সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) কিংবা অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রস্তাব—এসবকিছুকে অনেকে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক কারবারিরা। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় পরিসরে একক ধর্মীয় পরিচয় জোরদার হলে ভারতের বহুত্ববাদী আধ্যাত্মিকতার চরিত্রটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বারো বছর পর তাই আধ্যাত্মিক দিক থেকে ভারতের উত্থান যেমন হচ্ছে তেমনই সামাজিক মেরুকরণ ও অন্তর্দ্বন্দ্বের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তাই আগামীতে এই সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ সর্বজনীন হয়ে উঠবে, নাকি রাজনৈতিক বিতর্ক হিসেবে থেকে যাবে, এটাই এখন বড় প্রশ্ন।