“স্যান্ডউইচ মিডল ক্লাস”, রাঘব চাড্ডার মন্তব্যে শোরগোল!

রাঘব চাড্ডা দাবি করেন- স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১.৫ লক্ষ টাকা করা উচিত।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : লোকসভা বা রাজ্যসভার বাজেট অধিবেশন মানেই সাধারণত হট্টগোল, রাজনৈতিক আক্রমন আর পাল্টা আক্রমণ। কিন্তু ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেট নিয়ে রাজ্যসভায় আম আদমি পার্টির তরুণ সাংসদ রাঘব চাড্ডার এক বক্তৃতা আলাদা করে নজর কাড়ে। তিনি সরাসরি সরকারের সমালোচনা করলেও, বক্তৃতার কাঠামো ছিল ভিন্ন। “দ্য গুড, দ্য ব্যাড অ্যান্ড দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড”- এই ফ্রেমওয়ার্কে তিনি বাজেটকে বিশ্লেষণ করেন। এই বক্তব্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে- প্রথমত, চাপে থাকা ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। দ্বিতীয়ত, ক্রিপ্টো বা ডিজিটাল অ্যাসেট নিয়ে সরকারের অস্পষ্ট নীতি।

Sandwiched’ Middle Class

রাঘব চাড্ডার বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ ছিল তার Sandwich Class তত্ত্ব। তাঁর দাবি, ভারতের মধ্যবিত্ত এখন দুই দিক থেকে চাপে। একদিকে কর্পোরেট সেক্টর, যাদের জন্য কর ছাড় বা ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে দরিদ্র শ্রেণি, যারা বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় থাকে। মাঝখানে পড়ে যায় বেতনভোগী মধ্যবিত্ত। তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে ব্যক্তিগত আয়কর থেকে সরকারের আয় অনেক ক্ষেত্রে কর্পোরেট ট্যাক্সের থেকেও বেশি।
একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এটি অস্বাভাবিক প্রবণতা বলেই তিনি দাবি করেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, স্বাস্থ্য খরচ, শিক্ষা খরচ এবং শহুরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। ফলে হাতে থাকা আয় কমছে, আর সঞ্চয়ের সুযোগও কমছে।

Standard Deduction Debate

এই প্রেক্ষিতে চাড্ডা দাবি করেন- স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১.৫ লক্ষ টাকা করা উচিত। তার যুক্তি ছিল সরল- মধ্যবিত্তের হাতে বেশি টাকা থাকলে তারা খরচ করবে, আর সেই খরচ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়াবে। ভারতের অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করে ভোক্তা ব্যয়ের উপর। যদি মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ধাক্কা খেতে পারে।

Capital Market Logic- Speculation vs Investment

চাড্ডার বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পুঁজিবাজার নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি ডেরিভেটিভস বা F&O সেগমেন্টে সিকিউরিটিজ ট্রানজ্যাকশন ট্যাক্স বৃদ্ধিকে সমর্থন করেন। কারণ তার মতে, অতিরিক্ত জল্পনা বাজারকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন- যদি স্বল্পমেয়াদি জল্পনা নিরুৎসাহিত করা হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে কি? এই জায়গায় তিনি লং-টার্ম ক্যাপিটাল গেইনস বা LTCG ট্যাক্স তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। তার যুক্তি- ভারতে বিনিয়োগকারীকে প্রবেশের সময় STT দিতে হয়, আবার লাভের সময় LTCG দিতে হয়। ফলে বিনিয়োগের উপর দ্বৈত করের চাপ তৈরি হয়।

Global Comparison

চাড্ডা উদাহরণ দেন এমন কিছু দেশের, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উপর কর কম বা নেই। এর ফলে মানুষ শেয়ারবাজারে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়। তাঁর মতে, যদি LTCG কমানো বা তুলে দেওয়া হয়, তাহলে ঘরোয়া সঞ্চয় বাজারে আসবে এবং বিদেশি পুঁজির উপর নির্ভরতা কমবে।

Crypto Conundrum- Taxed but Not Recognised

বক্তৃতার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ভার্চুয়াল ডিজিটাল অ্যাসেট নিয়ে তার মন্তব্য। চাড্ডার বক্তব্য-


ভারত ক্রিপ্টোকে এমনভাবে ট্যাক্স করে যেন এটি বৈধ
কিন্তু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এমন আচরণ করে যেন এটি অবৈধ
এই দ্বৈত অবস্থান বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে

তার দাবি, কঠোর কর এবং অনিশ্চিত নীতির কারণে বিপুল ট্রেডিং ভলিউম বিদেশে চলে গেছে, বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো জায়গায়।

Regulatory Sandbox Proposal

সমাধান হিসেবে তিনি প্রস্তাব দেন- ক্রিপ্টো বা VDA-কে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ না করে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হোক। একটি “রেগুলেটরি স্যান্ডবক্স” তৈরি করা হলে-গ্রাফিক্স ইন
সরকার প্রযুক্তি বুঝতে পারবে
বিনিয়োগকারীরা সুরক্ষা পাবে
এবং সরকারও রাজস্ব হারাবে না

সঙ্গে AML বা মানি লন্ডারিং বিরোধী কঠোর নিয়ম রাখার কথাও বলেন তিনি।

Political Critique vs Economic Argument

চাড্ডার বক্তৃতা রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ হলেও, এর একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে। তিনি সরাসরি বাজেট বাতিলের কথা বলেননি। বরং কোথায় সমস্যা এবং কীভাবে সংশোধন করা যায়- সেই দিকেই জোর দিয়েছেন। এই কারণে অনেক অর্থনীতিবিদও তার বক্তব্যকে একটি কাঠামোগত সমালোচনা হিসেবে দেখছেন।

Gig Economy & Delivery Workers

বক্তৃতার শেষ অংশে চাড্ডা যে বিষয়টি সামনে আনেন, সেটি অর্থনীতির মানবিক দিককে তুলে ধরে- গিগ ওয়ার্কার এবং ডেলিভারি কর্মীদের বাস্তবতা। তিনি বলেন, অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি কর্মীরা আজ ভারতের শহুরে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাবার, ওষুধ, গ্রসারি- সব কিছুই এখন তাদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই কর্মীদের অধিকাংশেরই নেই- স্থায়ী চাকরি, স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন বা সামাজিক সুরক্ষা। চাড্ডার বক্তব্য ছিল, এরা অর্থনীতির “অদৃশ্য মেরুদণ্ড”। বাজেটে তাদের জন্য আলাদা সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো, বীমা এবং ন্যূনতম সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি যত বাড়বে, গিগ ওয়ার্কারের সংখ্যাও তত বাড়বে। তাই এখনই নীতি না তৈরি করলে ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে, এই বক্তৃতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সমালোচনা ছিল না। এটি ছিল ভারতের অর্থনীতির তিনটি বড় বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ- চাপে থাকা মধ্যবিত্ত, নীতিগত অনিশ্চয়তায় থাকা ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নিরাপত্তাহীন গিগ শ্রমিক শ্রেণি। রাঘব চাড্ডার বক্তব্য একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয় অর্থনৈতিক সংস্কার কি শুধুমাত্র সংখ্যার খেলা, নাকি সেই সংস্কারের কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের বাস্তব জীবন? আগামী দিনে বাজেট নীতি কতটা এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, সেটাই এখন দেখার।