স্মার্টফোনের দাপটে রেডিওর শব্দ যেন স্তব্ধ। ১০ মিনিট গানের জন্য ১৫ মিনিট বিজ্ঞাপন শুনতে নারাজ দর্শকরা। অচেনা ভারতীয় সন্ধ্যা কিংবা রাত ন’টার খবর।

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল: সকাল হোক বা সন্ধে, এফএমে বাজতো গান কিংবা টিভিতে খবর। এক সময়ের চেনা ভারতীয় সন্ধ্যা কিংবা রাত ন’টার খবর, আর সকালে অফিস যাওয়ার সময়ে এফএম আরজেদের হাসি-ঠাট্টা। আজ সেসব স্মৃতি। বসার ঘরে আর একসঙ্গে টিভি দেখার রেওয়াজ নেই। সকলে আলাদা আলাদা মোবাইল স্ক্রিনে ব্যস্ত। অ্যালগরিদম এখন সূচি ঠিক করে দেয়। প্রযুক্তির বদল শুধু যন্ত্রে নয়, অভ্যাসেও প্রভাব ফেলেছে।
সবচেয়ে চাপে রয়েছে এফএম রেডিও। স্মার্টফোনের দাপটে রেডিওর শব্দ যেন স্তব্ধ। স্ট্রিমিং অ্যাপের ‘স্পটিফাই এফেক্ট’ এখন শ্রোতাদের বেশি প্রিয়। ১০ মিনিট গানের জন্য ১৫ মিনিট বিজ্ঞাপন শুনতে নারাজ দর্শকরা। পছন্দমতো প্লেলিস্ট, বিজ্ঞাপনমুক্ত অভিজ্ঞতাই এখন তাদের বেশি প্রিয়। তাই মোবাইল ফোনও এখন অনেক বেশি মডিফায়েড। বহু আধুনিক ফোনে এফএম চিপই নেই। এফএম চালাতে আইনি বাঁধাও কম নয়। বেসরকারি এফএমে স্বাধীন সংবাদ সম্প্রচার নিষিদ্ধ। ফলে গান আর হালকা বিনোদনেই আটকে থাকতে হয়। অনলাইনে যেখানে এক ক্লিকেই ভুরি ভুরি তথ্য পাওয়া যায়, রেডিওতে যে তা অমিল, তাই এফএম রেডিও আর শ্রোতাদের টানে না।

এফএম রেডিওর পাশাপাশি স্যাটেলাইট টিভি বা ডিটিএইচের অবস্থাও শোচনীয়। বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে ‘কর্ড-কাটিং সুনামি’ আখ্যা দিচ্ছেন। গত পাঁচ বছরে পে-ডিটিএইচ গ্রাহক প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। রাত আটটায় ধারাবাহিক ধরার অভ্যাসও জেন জেড-এর কাছে অচেনা। অন-ডিমান্ড সবকিছু হাতের কাছে পেয়ে যাওয়াটাই এখনকার নিয়ম। ইউটিউবে সস্তা ব্রডব্যান্ডে ‘ফ্রি’ কন্টেন্ট দেখা অনেকের কাছে মাসিক ডিটিএইচ প্যাকের চাইতে সস্তা। তার উপর স্মার্ট টিভির বিস্তার ৪০ শতাংশ পেরিয়েছে। স্ক্রিনেই অ্যাপ ব্যাবহার করে যখন যা খুশি দেখা যাচ্ছে, তখন আলাদা করে সেট-টপ বক্স কেন?
সবমিলিয়ে বলা যেতে পারে, টিকে থাকতে হলে রূপান্তর জরুরি। বড় ডিটিএইচ সংস্থাগুলি—যেমন Tata Play, Airtel Digital TV, Dish TV—এখন ‘সুপার-অ্যাগ্রিগেটর’ অর্থাৎ একই প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন পরিষেবা দিতে শুরু করেছে। যেমন এক ইন্টারফেসে লিনিয়ার টিভি ও ওটিটি অ্যাপ, এক বিল, এক রিমোট।
গ্রামের দিকে এখনও স্যাটেলাইটের দাপট রয়েছে। ফাইবার ব্রডব্যান্ড সর্বত্র পৌঁছয়নি। আগামী দশকেও গ্রামীণ ভারতে স্যাটেলাইট প্রাসঙ্গিক থাকবে বলেই মত অনেকের।
নেট খরচ হয়ে গেলে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বাফারিং হতে থাকে। তার উপর দ্রুত লাইভ খবর পাওয়াটাও মুশকিল হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে খেলাধুলা বা ব্রেকিং নিউজে স্যাটেলাইট দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য।

এখন প্রশ্ন হল টিভি রেডিওকে বাঁচাতে কী করণীয়?
এফএমের ক্ষেত্রে সংবাদ সম্প্রচারের অনুমতি জরুরি। বিশেষ করে স্থানীয় খবরের জন্য। পাশাপাশি পডকাস্ট ও ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতে হবে। এয়ারওয়েভকে বিপণনের মাধ্যম করতে হবে। ডিটিএইচের ক্ষেত্রে দরকার ‘অ্যাড্রেসেবল অ্যাডভার্টাইজিং’ ও ‘স্যাশে প্রাইসিং’। দৈনিক/সাপ্তাহিক খবরের পাশাপাশি পেপার ভিউ খবর রাখতে হবে। যাতে অনিয়মিত দর্শকরাও সহজেই আকর্ষিত হন।
ডিজিটাল যুগ কনটেন্টের চাহিদা কমায়নি। পৌঁছনোর পথ বদলেছে। স্যাটেলাইট ও রেডিও এখনও বেঁচে রয়েছে। কিন্তু বিংশ শতকের অস্ত্রে একবিংশ শতকের যুদ্ধ জেতা যায় না। তাই ‘চ্যানেল’ নয়, ‘সুবিধা’ ও ‘কমিউনিটি’-কে বিক্রি করাই এখন মূল মন্ত্র।