যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে আমেরিকা-রাশিয়ার মতো বড় দেশ কেন বাদ পড়ল?

আরপ্লাস নিউজ ডিজিটাল ডেস্ক : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিমান কেনাবেচার খেলাটা অনেকটা অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ পোকার খেলার মতো। বড় বাজি, বড় ঝুঁকি, আর ভুল চাল মানেই বহু দশকের ক্ষতি। সেই খেলায় ভারত সম্প্রতি নিজের তাস গুছিয়ে নিয়েছে। আমেরিকার এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার কিংবা রাশিয়ার সুখোই-৫৭ ‘ফেলন’—দু’টিকেই কার্যত পাশ কাটিয়ে নয়াদিল্লি ফের বাজি ধরেছে ফ্রান্সের দাসোঁ রাফায়েলের উপর। নৌবাহিনীর জন্য রাফায়েল-এম (মেরিন) এবং বায়ুসেনার জন্য অতিরিক্ত রাফায়েল—এই সিদ্ধান্ত অনেকের চোখে আপোস মনে হলেও, বাস্তবে এটি কৌশলগত স্বাধিকার রক্ষার এক নিখুঁত মাস্টারস্ট্রোক।
এখন প্রশ্ন হল যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে আমেরিকা-রাশিয়ার মতো বড় দেশ কেন বাদ পড়ল?

এফ-৩৫: ডিজিটাল শিকলের ভয়
কাগজে-কলমে এফ-৩৫ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান। কিন্তু ভারতের জন্য এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল এক অদৃশ্য শর্ত। এই বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা (ODIN) সম্পূর্ণ আমেরিকার সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ কোনও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে ওয়াশিংটন নিরপেক্ষ থাকলে, তাত্ত্বিকভাবে একটি সফটওয়্যার আপডেটেই ভারতের গোটা বহর মাটিতে বসে যেতে পারে। তার উপর ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ বা সোর্স কোডে প্রবেশাধিকার—কিছুই দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। ভারতীয় অ্যাস্ট্রা মিসাইল বা পারমাণবিক অস্ত্র সংযোজন? একেবারেই অসম্ভব।
সুখোই-৫৭: কাগুজে বাঘ?
রাশিয়া বহু দশক ধরে ভারতের বন্ধু। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের পরে বাস্তবটা বদলেছে। নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত রাশিয়ার শিল্পব্যবস্থা আগামী ৩০ বছর নিরবচ্ছিন্ন স্পেয়ার পার্টস জোগান দিতে পারবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তার উপর ভারতীয় বায়ুসেনার অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে সুখোই-৫৭-এর স্টেলথ ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, বিশেষত চিনের জে-২০-র তুলনায়।
তাহলে রাফায়েল কেন?
রাফায়েল কোনও পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ নয়। তবু এটি ৪.৫ প্রজন্মের ‘অমনি-রোল’ ফাইটার, যা নিজের সীমা অতিক্রম করে কাজ করতে পারে। আসল জয়টা হল স্বাধীনতায়। ফ্রান্স একমাত্র বড় শক্তি, যারা ভারতকে রাফায়েলে পারমাণবিক ভূমিকা পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। অনুমতির জন্য প্যারিসের দরজায় কড়া নাড়তে হবে না। নৌবাহিনীর আইএনএস বিক্রান্তে রাফায়েল-এম আনার ফলে বায়ুসেনা ও নৌবাহিনীর মধ্যে একটাই ইঞ্জিন, একটাই মিসাইল (মিটিয়র, স্কাল্প), একটাই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাফায়েল একটি সেতু। আগামী ১০–১৫ বছর এটি আকাশে আধিপত্য বজায় রাখবে, যতদিন না ডিআরডিও-র AMCA (অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট) বাস্তব রূপ পাচ্ছে, ততদিন এফ-৩৫ কিনলে দেশীয় স্টেলথ প্রকল্প কার্যত শেষ হয়ে যেত।
চিনের জে-২০-এর সামনে কি দুর্বল ভারত?
পুরোপুরি নয়।রাফায়েলের হাতে থাকা ‘মিটিয়র’ মিসাইলের ‘নো-এস্কেপ জোন’ বিশ্বের সেরাদের মধ্যে অন্যতম। যা শত্রু ধরা পড়ার আগেই আঘাত হানার ক্ষমতা রাখে। রাফালয়ে-এম নৌবাহিনীর ক্ষমতা আমূল বদলে দেবে। দুর্বল মিগ-২৯এর বদলে শক্তিশালী এই বিমান ভারত মহাসাগরে চিনের ‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ কৌশলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর আছে SPECTRA ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। আকৃতিতে স্টেলথ না হলেও, শত্রু ব়্যাডারকে এমনভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে, যে কার্যত ‘ভার্চুয়াল স্টেলথ’ তৈরি হয়।
সবমিলিয়ে এফ-৩৫ বা সু-৫৭ না নেওয়াটা আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। কাঁচা প্রযুক্তির জাঁকজমকের চেয়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণটা ভারতের পক্ষে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স
ভারতকে ক্লায়েন্ট হিসেবে নয় বরং সমান অংশীদার হিসেবে ভাবে। বর্তমানে ভারতের আকাশকে পাহারা দিচ্ছে ফরাসি রাফায়েল, আগামীদিনে তা রক্ষা করবে বেঙ্গালুরুর কারখানায় ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সুপার-জেট।