বর্ষবরণে সেই ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা!

কী বললেন নিতাই রায় চৌধুরী ?

রিয়া দাস, সাংবাদিক : নির্বাচনের উত্তাপ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ক্ষমতার পালাবদলের রেশ রয়ে গেছে। নতুন অধ্যায় শুরি করেছে বাংলাদেশ। নতুন সরকার, নতুন প্রতিশ্রুতি, নতুন দিশা। আর ঠিক সেই সময়েই দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে বাঙালির সবচেয়ে আবেগের উৎসব পয়লা বৈশাখ। কিন্তু এবাবের বৈশাখ যেন শুধু নতুন বছরের বার্তা নয় সঙ্গে নিয়ে এসেছে পরিচয়ের নতুন প্রশ্নও। কারণ উৎসব একই থাকলেও বদলে যাচ্ছে তার এক গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন শোভাযাত্রার নাম। বর্ষবরণের সেই ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা যা বহু বছর ধরে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে পরিচিত ছিল সেটিই আবার নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত এবার থেকে আর মঙ্গল নয়, আনন্দও নয় শোভাযাত্রার নাম হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা। সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ঘোষণায় যেন স্পষ্ট সেই বার্তা-

“নাম নিয়ে একটা বিতর্ক রয়েছে
আমরা এই বিতর্কের অবসান চাই
এটা নিয়ে আগেও বড় মিটিং করেছি
এবার থেকে আমাদের সরকারি সিদ্ধান্ত
আমরা এটাকে আনন্দ শোভাযাত্রাও বলব না
মঙ্গল শোভাযাত্রাও বলব না
শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে
তার নাম হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা’
নিতাই রায় চৌধুরী, সংস্কৃতি বিষয়কমন্ত্রী

বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে উৎসবকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক তার মূল পরিচয়ে বৈশাখের নিজস্ব সত্তায়। কিন্তু ইতিহাসের স্তরগুলো কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়? এই শোভাযাত্রার জন্ম তো নিছক উৎসবের আনন্দে নয় বরং এক প্রতিরোধের ভিতর দিয়ে। বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ বর্ষবরণ শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে বিতর্কের বিষয়ে জানতে চাইলে এর ই-মেল বার্তায় ইউনেস্কোর হেড অফ অফিস অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ বলেছেন, ইউনেস্কো নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে কোনও অবস্থান নেয় না, কারণ এ ধরনের বিষয় সদস্য রাষ্ট্রগুলির নিজস্ব এক্তিয়ার ও সিদ্ধান্তের মধ্যে পড়ে। যদি বাংলাদেশ সরকার এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় তবে ইউনেস্কোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল এই পথচলা। তখন তার নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। পরে নব্বইয়ের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের আবহে আনন্দ শব্দের জায়গা নেয় মঙ্গল। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির আহ্বান। এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। সেই নামের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক সময়ের প্রতিবাদ, এক সময়ের স্বপ্ন, এক সময়ের লড়াই। কিন্তু সময় বদলায়, রাজনীতি বদলায় আর তার সঙ্গে বদলায় শব্দের ব্যাখ্যাও। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মঙ্গল শব্দকে ঘিরে আপত্তি ওঠে এবং নাম বদলে রাখা হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। তবুও এই নিয়ে বিতর্ক থামেনি। এবার নতুন নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের হাত ধরে সেই বিতর্কে টানা হলো এক নতুন রেখা। নাম দেওয়া হল বৈশাখী শোভাযাত্রা।

এই সরকারের যুক্তি পরিষ্কার এই উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু হোক বৈশাখ নিজেই। তাই বৈশাখী মেলা, বৈশাখী আনন্দ, বৈশাখী উদযাপন সবকিছুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শোভাযাত্রার নামও হোক বৈশাখী। যেন এক ছাতার নিচে এক হয়ে যায় পুরো উৎসবের আবহ। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায় নাম বদলালে কি বদলে যায় তার আত্মা। না সেই আত্মা রয়ে যায় মানুষের স্মৃতিতে, অনুভবে, ইতিহাসে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে আসতেই হয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গে। মঙ্গল শোভাযাত্রা ইতিমধ্যেই ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। ইউনেস্কো স্পষ্ট জানিয়েছে নাম পরিবর্তন একটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলেও সেই পরিবর্তনকে স্বীকৃতির কাঠামোর মধ্যে আনতে হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ নাম বদলানো যতটা সহজ তার ইতিহাসকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা ততটাই জটিল। ঢাকার রাস্তায়, চারুকলার আঙিনায়, মুখোশের রঙে, ঢাকের তালে। এই শোভাযাত্রা আজ শুধু একটি অনুষ্ঠান নয় এটি এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কখও আনন্দ, কখনও মঙ্গল আর এখন বৈশাখী নামের পরিবর্তন যেন সময়ের সঙ্গে সমাজ ও রাজনীতির ওঠাপড়ারই প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি নাম এক একটি সময়কে ধারণ করে এক একটি আবেগকে বাঁচিয়ে রাখে।

তবুও সব কিছুর শেষে একটা দৃশ্য একই থাকে পয়লা বৈশাখের সকাল। লাল-সাদা শাড়ি, পাঞ্জাবি, মুখে হাসি, হাতে রঙিন মুখোশ আর একসঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দ। সেই আনন্দের কোনও নির্দিষ্ট নাম নেই, কোনও রাজনৈতিক রঙ নেই, কোনও বিতর্কের সীমারেখা নেই। চারুকলা বিভাগের একাংশের মতে মঙ্গল শব্দের আপত্তির কারণেই এই শোভাযাত্রার নাম পাল্টে ছিল ইউনুস সরকার। এবার সেই একই পথে হাঁটল তারেক রহমানের সরকারও। হয়তো তাই, নাম নিয়ে যতই তর্ক হোক উৎসব কিন্তু তার নিজের ছন্দেই বেঁচে থাকে। তবুও সব বিতর্কের শেষে থেকে যায় একটাই প্রশ্ন, উৎসবের প্রাণ কোথায়? নামের মধ্যে না মানুষের অংশগ্রহণে।