ভোট পরীক্ষা শেষ – মা ফলেষু কদাচন!

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, দাবি করেন যে বিজেপি ৫০টির কম আসনে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তৃণমূল ২৩০-২৫০টিরও বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে।

শ্রেয়সী বল, সাংবাদিক : ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় তথা শেষদফার ভোটপর্ব মিটছে। ৪ঠা মেয়ে ফলাফল। এরাজ্যে লড়াই মুলত তৃণমূল বিজেপির হলেও, অস্তিত্ব প্রমানে কোনও খামতি রাখেনি কংগ্রেস,সিপিএম,আইএসএফ ও মিম। তালাকায় ছিল হুমায়ুন কবিরের নতুন দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টি।প্রার্থী,কেন্দ্র,মনোস্ততত্ব ও আত্মবিশ্বাসের নিরিখে ভোটের ময়দান রাজনৈতিক দলগুলির প্রত্যাশা কি? বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক মহলের মতামতের ওপর নির্ভর করে সেই তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

প্রথমেই আসা যাক শাসকদল তৃণমূলের কথায়। তৃণমূল তাদের প্রচারে মূলত ‘উন্নয়ন’ ও ‘বাংলায় উন্নয়ন’ ধরে রাখার ইস্যুকে সামনে রেখে এগিয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী দেখা যায়। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, দাবি করেন যে বিজেপি ৫০টির কম আসনে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং তৃণমূল ২৩০-২৫০টিরও বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করবে। বিধানসভা নির্বাচনে নিজের মসনদ ধরে রাখাই প্রধান চ্যালেঞ্জ তৃণমূল কংগ্রেসের।এরপরই শাসকদলের টার্গেট বিজেপি-র শক্ত ঘাঁটি ভাঙা, মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধার, এবং সাংগঠনিকভাবে দুর্বল কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানো। এবার আসা যাক, যাক মুখ্যমন্ত্রীর গড় ভবানিপুর কেন্দ্রের কথায়। যেখানের প্রার্থী মমতা নিজেই। এখানে তার বিপরীতে লড়াইয়ে নেমেছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। এখানে সংখ্যালঘু ভোটারদের সাথে নিয়ে অবাঙালিভোটারদের একাংশকে উন্নয়নমূলক কাজের মাধ্যমে নিজেদের দিকে রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছে তৃণমূল।সেই সঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী-র ঘনঘন প্রচার এবং বিজেপি-র শক্তিবৃদ্ধির মোকাবিলায় তৃণমূল স্থানীয় ছোট ছোট সভা এবং বাড়ি বাড়ি প্রচারে জোর দেয়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে এই কেন্দ্রে ব্যবধান কমে যাওয়ায়, তৃণমূল ভবানীপুরে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে প্রতিটি ভোট নিশ্চিত করার পথে হাঁটে। প্রার্থীদের প্রসঙ্গে বলতে গেলে তৃণমূল কংগ্রেস মূলত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তাদের পুরনো ও পরীক্ষিত সৈনিক যেমন ফিরহাদ হাকিম ,মহুয়া মৈত্র,শত্রুঘ্ন সিনহা,ইউসুফ পাঠান, জুন মালিয়া,জগদীশচন্দ্র বাসুনিয়া,রুখবানু রহমান,শুভঙ্কর সিংহের ওপরই বেশি ভরসা রেখেছিল, পাশাপাশি তরুণ ও তারকা মুখ যেমন কোয়েল মল্লিক, রাজীব কুমার, শ্রেয়া পান্ডে, বাবর আলি ও অভিনব ভট্টাচার্যদেরও গুরুত্ব দিয়েছিল। এছাড়াও কুণাল ঘোষ ও অরূপ বিশ্বাসের মতো সাংগঠনিক নেতাদের বিভিন্ন দায়িত্ব ও মুখপাত্র হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল।

এবার আসা যাক বিজেপির প্রত্যাশার কথায়।বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বেশকিছু নির্দিষ্ট কেন্দ্রকে বিশেষ নজরে রেখেছিল, যার মূল কারণ ছিলো ২০২১-র নির্বাচনের ব্যবধান কমানো, গোষ্ঠীগত সমীকরন এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্যে ভাঙন ধরানো। বিশেষ করে তাঁদের টার্গেটে ছিল সেই ১৫৫টি আসন যেখানে ২০২১ সালে তারা দ্বিতীয় স্থানে ছিল।নন্দীগ্রামের মতো কেন্দ্র, যেখানে শুভেন্দু অধিকারী মমতাকে খুব কম ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর মাধ্যমে এই কেন্দ্রটি বিজেপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসন ছিল।এছাডা়ও কৃষ্ণনগর দক্ষিণ ,চাকুলিয়া ও মতুয়া প্রভাবিত আসন ,উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদীয়া, হাওড়া, হুগলি এবং পূর্ব বর্ধমানের মত আসনগুলোতে বিশেষ নজরে ছিল বিজেপির। প্রার্থী প্রসঙ্গে যদি আসা যায়, তাহলে মাথাভাঙায় নিশীথ প্রামাণিক এবং নোয়াপাড়ায় অর্জুন সিংয়ের মতো হেভিওয়েট ও রেখা পাত্র,কলিতা মাঝি মত সাধারনের মাঝে মিশে যাওয়া প্রার্থীদের ওপর ভরসা রেখেছিল গেরুয়া শিবির।

এদিকে ২০২৬ এর রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এককভাবে লড়াই করার ইঙ্গিত দিয়ে বাম-কংগ্রেস জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে ২৯৪টি আসনেই প্রার্থী দেয়।এবারে কংগ্রেসের রণকৌশল ছিল -দলীয় সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং পুরনো ভোটব্যাংক ফিরে পাওয়া,অধীর চৌধুরীর মতো নেতার উপস্থিতিতে দলীয় কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি ও রাজ্যের প্রধান বিরোধী হিসেবে বিজেপি ও বামেদের টপকে নিজেদের অবস্থান মজবুত করা।এবারের ভোটে প্রায় তিন দশক পর অধীর রঞ্জন চৌধুরী বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় কংগ্রেসের জন্য এই কেন্দ্রগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। মুর্শিদাবাদে কংগ্রেসের যে শক্ত ঘাঁটি ছিল, তা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালায় তারা।উত্তর দিনাজপুরের চাকুলিয়া এবং কোচবিহারের সিতাইয়ের মতো কেন্দ্রগুলো কংগ্রেসের নজরে ছিল। সিতাইয়ে সম্প্রতি উপনির্বাচনে কংগ্রেসের ভোট বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা সেখানে বাড়তি আশাবাদী ছিলেন।নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর দক্ষিণ এবং উত্তর ২৪ পরগনার কিছু কেন্দ্র, যেখানে মতুয়া ভোটাররা নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে, সেখানে কংগ্রেস ভালো ফলের প্রত্যাশা করছিল।কংগ্রেস রাজ্যে বামেদের সাথে সরাসরি জোট না করলেও, কিছু কেন্দ্রে নীরব বোঝাপড়ার মাধ্যমে তৃণমূল ও বিজেপিকে টেক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। নির্বাচনী লড়াইয়ে কংগ্রের অধীর রঞ্জন চৌধুরী, মৌসম বেনজির নূর, রোহন মিত্র, দলের রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, প্রদীপ প্রসাদের মত অভিজ্ঞ প্রার্থীদের ওপর ভরসা রেখেছিল কংগ্রেস। এছাডা়ও উত্তরপাড়া, ডোমজুড়, চাঁপদানি ও সিঙ্গুরের মতো আসনে প্রীতম ঘোষ, বরুণ কুমার মালিকদের মতো প্রার্থীদের মনোনয়ন দিয়েছে দল।

এদিকে বামেরা রাজ্যের শ্রমজীবী মানুষ, ছাত্র ও যুবকদের ওপর ভরসা করে নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফেরাতে চেয়েছিল।, বিশেষ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় ছাত্রভোটের (SFI) বড় জয় তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছিল ।২০২১ সালের ফলাফলের পর তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল তৃণমূলে বা বিজেপিতে চলে যাওয়া ভোটব্যাঙ্ক পুনরুদ্ধার করা এবং তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করা।বামেরা এবার কংগ্রেসের সাথে জোটে না গিয়ে, নিজস্ব শক্তিশালী সংগঠনের ওপর ভর করে এবং ছাত্র-যুবক ও শ্রমজীবীদের ইস্যু নিয়ে লড়াই করার নীতি গ্রহণ করেছিল।তাদের নজরে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল- করণদিঘী, যাদবপুর ,উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চল জগদ্দল ও ব্যারাকপুর, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া অর্থাৎ জঙ্গলমহলের এই এলাকাগুলোতে পুরনো সংগঠন পুনরুজ্জীবিত করা ছিল বামেদের অন্যতম লক্ষ্য। বাম নেতৃত্ব পুরোনো ভোটব্যাঙ্ক ফেরাতে তরুণ নেতা-কর্মী, মতুয়া প্রতিনিধি এবং শিক্ষিত যুবকদের সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিল। তাদের ভরসার প্রথম সারিতে ছিল দীপ্সিতা ধর,মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও কলতান দাশগুপ্তরা। এড়াও ছিলেন গৌর বিশ্বাস,হেমন্ত দাস,পারভেজ আহমেদ খানের মত প্রার্থীর এছাড়াও লড়াইয়ে আছে নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ, আসাদউদ্দিন ওয়াইসির মিম, ও হুমায়ুন কবীরের নতুন দল আম জনতা উন্নয়ন পার্টির মত দলগুলি।সবাইকেই রাজ্যে নিজের মাটি শক্ত করতে মরিয়া হতে দেখা যায়। তবে কাকে ঠিক কতটা জমি দেবে বা উৎখাত করবে রাজ্যের মানুষ। যা বন্দি এখন ব্যলট বক্সে। ৪ ঠা মেয়ে রাজ্যের জনগনের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে রাজনৈতি দলগুলি ভবিষ্যত। তবে এবারে রাজ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরছে পরিবর্তন নাকি প্রত্যাবর্তন ?